এপস্টাইন ফাইলস: খুলে পড়েছে পশ্চিমা মানবাধিকারের মুখোশ

প্রচ্ছদবার্তা ও বিবৃতি

এপস্টাইন ফাইলস: খুলে পড়েছে পশ্চিমা মানবাধিকারের মুখোশ

সমস্ত প্রশংসা সেই মহান আল্লাহর যিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যের একমাত্র মালিক, যার জ্ঞানের বাইরে এই মহাবিশ্বের কোনো গোপন দ্বীপ বা অন্ধকার প্রকোষ্ঠ নেই। সকল প্রশংসা সেই মহান সত্তার, যিনি মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনার জন্য পাঠিয়েছেন আল-কুরআন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক মানবতার মুক্তিদূত, জালিমের আতঙ্ক এবং মজলুমের আশ্রয়স্থল জনাবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর, তাঁর পরিবারবর্গ এবং সাহাবায়ে কেরামের ওপর।

বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দীতে পশ্চিমা বিশ্ব নিজেদেরকে মানবতার ত্রাণকর্তা, সভ্যতার আলোকবর্তিকা এবং মানবাধিকারের ধারক-বাহক হিসেবে বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় তাদের এই তথাকথিত ‘সভ্যতা’র মোড়ক আজ খসে পড়ছে। সাম্প্রতিক ‘জেফ্রি এপস্টাইন ফাইলস’ জনসমক্ষে আসা কেবল একটি আইনি নথির প্রকাশ নয়, বরং এটি পশ্চিমা উচ্চবিত্ত এবং নীতিনির্ধারক সমাজের চূড়ান্ত নৈতিক দেউলিয়াত্বের দালিলিক প্রমাণ। যারা বিশ্বকে নীতি-নৈতিকতার পাঠ দেয়, পর্দার আড়ালে তারা কতটা জঘন্য ও পাশবিক হতে পারে, এপস্টাইন ফাইলস তার জীবন্ত সাক্ষী।

​এপস্টাইন ফাইলস: কী ঘটেছিল সেই অন্ধকার দ্বীপে?
​জেফরি এপস্টাইন, একজন মার্কিন ধনকুবের এবং যৌন পাচারকারী, যে দশকের পর দশক ধরে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন শোষণের এক বিশাল নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেছে। তার এই জঘন্য কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা, রাজপরিবারের সদস্য এবং বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা। ২০১৯ সালে কারাগারে সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হাজার হাজার পৃষ্ঠার দলিল এবং আদালতি রেকর্ড থেকে বেরিয়ে এসেছে এমন সব তথ্য যা পশ্চিমা উচ্চবিত্তদের অপরাধের গভীরতা প্রকাশ করে।

এপস্টাইনের মালিকানাধীন বিভিন্ন সম্পত্তি, নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে প্রাসাদোপম বাড়ি, ফ্লোরিডায় পাম বিচের বাসভবন, নিউ মেক্সিকোর বিশাল খামার এবং ক্যারিবিয়ান সাগরের “লিটল সেন্ট জেমস” দ্বীপ যা “পেডোফাইল আইল্যান্ড” নামে কুখ্যাত হয়ে উঠেছিল, এসব স্থানে সংঘটিত হয়েছে ভয়াবহ অকল্পনীয় নির্যাতন।

এসব কুকর্মে লিপ্ত ছিল বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশ, বিল ক্লিনটন, মার্কিন নীতি নির্ধারক পর্যায়ের অনেক ব্যক্তিত্ব, সৌদি রাজপরিবারের সদস্য, বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং, বিলিয়নিয়ার এলন মাস্ক, বিল গেটস এবং প্রভাবশালী মিডিয়া ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্ন দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।

নথি এবং ভুক্তভোগী মেয়েদের বয়ান অনুযায়ী, তাদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো, ছোট ছোট মেয়ে শিশুদের উপর চালানো হত বিকৃত যৌনাচার, তাদেরকে মাদকাসক্ত করা হতো এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মনোরঞ্জনের জন্য পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হতো। কিছু মেয়ে শিশুদের যৌন নির্যাতন চালানোর পর তাদের মাংসও খেয়ে ফেলা হতো, ভ্রুণ দিয়ে বানানো হতো স্যুপ।
ভার্জিনিয়া রবার্টস গিউফ্রে, যিনি মাত্র ১৬ বছর বয়সে এপস্টাইনের ফাঁদে পড়েছিলেন, তার সাক্ষ্যে জানিয়েছেন কীভাবে তাকে বিশ্বের বিভিন্ন ক্ষমতাশালী ব্যক্তির কাছে “উপহার” হিসেবে পাঠানো হতো। ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স অ্যান্ড্রু থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে তাকে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি বর্ণনা করেছেন কীভাবে এপস্টাইনের দ্বীপে নিয়মিত “অর্জি পার্টি” আয়োজন করা হতো যেখানে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ক্রীতদাসের মতো ব্যবহার করা হতো।

আরেক ভুক্তভোগী সারাহ রনসম তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন, মাত্র ১৫ বছর বয়সে তাকে এপস্টাইনের যৌন দাসী হতে বাধ্য করা হয়। তিনি বর্ণনা করেছেন কীভাবে তাকে প্রতিদিন একাধিকবার যৌন নির্যাতন করা হতো এবং অন্যান্য মেয়েদের “প্রশিক্ষণ” দিতে বাধ্য করা হতো। যারা প্রতিবাদ করতো তাদের শারীরিক নির্যাতন ও ভয় দেখানো হতো। তাকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়ে যাওয়া হতো এবং সেখানে এপস্টাইনের “বন্ধুদের” সাথে অশ্লীলতায় লিপ্ত হতে বাধ্য করা হতো।

শিল্পী ম্যারিয়া ফার্মার জানিয়েছেন কীভাবে এপস্টাইন এবং গিসলাইন ম্যাক্সওয়েল তার এবং তার ছোট বোনকে যৌন নির্যাতন করেছিল। তিনি বলেন, এপস্টাইনের নেটওয়ার্ক এতটাই শক্তিশালী ছিল যে পুলিশ ও এফবিআই-এর কাছে অভিযোগ করার পরও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল এবং তার পেশাগত জীবন ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
এপস্টাইন এবং তার সহযোগীরা একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা তৈরি করেছিল যেখানে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের প্রলোভন দেখিয়ে বা প্রতারণা করে নিয়ে আসা হতো। তাদের “ম্যাসেজ থেরাপিস্ট” হিসেবে নিয়োগের কথা বলা হলেও বাস্তবে তাদের যৌন দাসী বানানো হতো। যারা নতুন মেয়ে নিয়ে আসতো তাদের আর্থিক পুরস্কার দেওয়া হতো, এভাবে একটি পিরামিড স্কিম তৈরি হয়েছিল। অনেক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হতো এবং পালানোর চেষ্টা করলে জীবননাশের হুমকি দেওয়া হতো।

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো, এই অপরাধ দশকের পর দশক চলেছে অথচ তাদের তথাকথিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ২০০৮ সালে এপস্টাইন একবার গ্রেফতার হলেও তৎকালীন ফ্লোরিডার প্রসিকিউটর (পরবর্তীতে মার্কিন শ্রম সচিব) আলেক্স আকোস্তা তার সাথে একটি গোপন চুক্তি করেন যেখানে তার মাত্র ১৩ মাসের সাজা হয় এবং দিনের বেশিরভাগ সময় কারাগারের বাইরে কাটানোর সুবিধা দেওয়া হয়। এই “সুইটহার্ট ডিল” ছিল ন্যায়বিচারের সাথে চরম উপহাস।

এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, পশ্চিমা পুঁজিবাদী সমাজে টাকা এবং ক্ষমতা থাকলে যেকোনো জঘন্য অপরাধ করে পার পাওয়া যায়। তথাকথিত ‘লিবারেল’ সমাজব্যবস্থা এই অপরাধীদের বছরের পর বছর সুরক্ষা দিয়ে এসেছে।

পশ্চিমা মানবাধিকারের ভণ্ডামি
পশ্চিমা দেশগুলো বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারের ধ্বজাধারী হিসেবে নিজেদের জাহির করে। তারা অন্যান্য দেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, সামরিক হস্তক্ষেপ চালায় এবং “সভ্যতা” ও “গণতন্ত্র” প্রতিষ্ঠার নামে লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করে। অথচ তাদের নিজেদের দেশে, তাদের নিজেদের ক্ষমতাশালীদের দ্বারা সংঘটিত হয় সবচেয়ে জঘন্যতম অপরাধ।

যে পশ্চিমা মিডিয়া মুসলিম দেশগুলোতে শরিয়াহ আইনকে “বর্বর” বলে প্রচার করে, তারা নিজেদের দেশে শিশু যৌন নির্যাতনের এই বিশাল নেটওয়ার্ক সম্পর্কে চুপ থাকে। যে মানবাধিকার সংস্থাগুলো অন্যদের বিচার করে, তারা নিজেদের সমাজের এই কলঙ্ক নিয়ে কথা বলে না। যে নারীবাদীরা হিজাবকে “নিপীড়ন” বলে আখ্যা দেয়, তারা এপস্টাইনের শিকার মেয়েদের জন্য একই মাত্রায় সোচ্চার হয় না।

এপস্টাইন ফাইল প্রমাণ করে যে পশ্চিমা “স্বাধীনতা” ও “অধিকার” শুধুমাত্র শক্তিশালীদের জন্য। দুর্বলদের, বিশেষত নারী ও শিশুদের, কোনো অধিকার নেই যখন ক্ষমতাবানরা তাদের শোষণ করতে চায়। পশ্চিমা আইনি ব্যবস্থা যা “নিরপেক্ষতা” ও “ন্যায়বিচারের” দাবি করে, তা আসলে ধনী ও ক্ষমতাশালীদের রক্ষা করার একটি হাতিয়ার মাত্র।

পশ্চিমা আইনি ব্যবস্থার ভন্ডামি
এপস্টাইন মামলা পশ্চিমা আইনি ব্যবস্থার ভন্ডামি প্রকাশ করেছে। দশকের পর দশক ধরে অসংখ্য অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এপস্টাইনকে আইনের আওতায় আনা হয়নি। ক্ষমতা ও অর্থ তাকে বিচারের ঊর্ধ্বে রেখেছিল। যেসব মেয়ে সাহস করে এগিয়ে এসে অভিযোগ করেছিল, তাদের বিশ্বাস করা হয়নি, বরং তাদের চরিত্র হনন করা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রসিকিউটর এবং বিচারকরা এপস্টাইনকে সুবিধা দিয়েছে। ২০০৮ সালে তার সাথে করা “সুইটহার্ট ডিল” এর উজ্জ্বল প্রমাণ।
এপস্টাইনের মৃত্যুর পরিস্থিতি এখনো রহস্যাবৃত। তার সাথে জড়িত অনেক শক্তিশালী ব্যক্তির নাম চাপা দেওয়া হয়েছে।

শত শত মেয়ের জীবন ধ্বংস করার পরও খুব কম সংখ্যক ব্যক্তি শাস্তি পেয়েছে। গিসলাইন ম্যাক্সওয়েল ছাড়া এপস্টাইনের নেটওয়ার্কের আর কেউ তেমন শাস্তি পায়নি।

যৌন বিপ্লবের অন্ধকার দিক
পশ্চিমা সমাজে “যৌন স্বাধীনতা” ও “যৌন বিপ্লবের” নামে যা চালু করা হয়েছে তার পরিণতি এপস্টাইন কেলেঙ্কারিতে স্পষ্ট। যখন সমাজ থেকে সকল নৈতিক বাধা তুলে নেওয়া হয়, যখন কোনো কিছুকেই “ট্যাবু” বলা যায় না, তখন শক্তিশালীরা দুর্বলদের শোষণ করার সুযোগ পায়। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে যৌনতার যে বাণিজ্যিকীকরণ ও বস্তুকরণ হয়েছে, তা নারী ও শিশুদের পণ্যে পরিণত করেছে।

হলিউডে ব্যাপক যৌন নির্যাতন, ক্যাথলিক চার্চে হাজার হাজার শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনা, ব্রিটেনে শত শত সেলিব্রিটি ও রাজনীতিবিদের যুক্ত পেডোফাইল রিং এসব হলো পশ্চিমা নৈতিক অধঃপতনের প্রমাণ। এপস্টাইন কেলেঙ্কারি তার ক্ষুদ্রতম একটি অংশমাত্র।

ইসলামি শরিয়াহ: প্রকৃত সমাধান
পশ্চিমা বিশ্ব যে নৈতিক সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে, তার একমাত্র ও স্থায়ী সমাধান রয়েছে ইসলামি শরিয়াহর মধ্যে। ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা যা ব্যক্তির চারিত্রিক পবিত্রতা এবং সমাজের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।

ইসলাম নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং যৌন উস্কানিমূলক পরিবেশকে নিষিদ্ধ করে। পশ্চিমা সমাজে যৌনতার যে প্রকাশ্য প্রদর্শনী চলে তা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেন:

وَ لَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّهٗ كَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَ سَآءَ سَبِیۡلًا

আর যিনা-ব্যভিচারের কাছেও যেও না, তা হচ্ছে অশ্লীল কাজ আর অতি জঘন্য পথ। (সূরা আল ইসরা : ৩২)

ইসলামে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। চারজন নিরপেক্ষ সাক্ষীর সাক্ষ্য বা স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে প্রমাণিত হলে বিবাহিত ব্যক্তির জন্য পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড এবং অবিবাহিত ব্যক্তির জন্য ১০০ বেত্রাঘাতের বিধান। এই কঠোর শাস্তি সমাজে যৌন অপরাধ প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর এবং তা প্রমাণিত।

আবু হুরায়রা ও যায়েদ ইবন খালিদ জুহানী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত তারা বলেন

«جَاءَ أَعْرَابِيٌّ فَقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! اِقْضِ بَيْنَنَا بِكِتَابِ اللهِ، فَقَامَ خَصْمُهُ فَقَالَ: صَدَقَ، اِقْضِ بَيْنَنَا بِكِتَابِ اللهِ ، فَقَالَ الْأَعْرَابِيُّ: إِنَّ ابْنِيْ كَانَ عَسِيْفاً عَلَى هَذَا، فَزَنَى بِامْرَأَتِهِ ، فَقَالُوْا لِيْ: عَلَى ابْنِكَ الرَّجْمُ، فَفَدَيْتُ ابْنِيْ مِنْهُ بِمِئَةٍ مِنَ الْغَنَمِ وَوَلِيْدَةٍ، ثُمَّ سَأَلْتُ أَهْلَ الْعِلْمِ فَقَالُوْا: إِنَّمَا عَلَى ابْنِكَ جَلْدُ مِئَةٍ وَتَغْرِيْبُ عَامٍ، فَقَالَ النَّبِيُّ e: لَأَقْضِيَنَّ بَيْنَكُمَا بِكِتَابِ اللهِ ، أَمَّا الْوَلِيْدَةُ وَالْغَنَمُ فَرَدٌّ عَلَيْكَ، وَعَلَى ابْنِكَ جَلْدُ مِئَةٍ وَتَغْرِيْبُ عَامٍ، وَأَمَّا أَنْتَ يَا أُنَيْسُ! فَاغْدُ عَلَى امْرَأَةِ هَذَا فَارْجُمْهَا ، فَغَدَا عَلَيْهَا أُنَيْسٌ فَرَجَمَهَا»

“জনৈক বেদুঈন ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললো: হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের মাঝে কোর‘আনের ফায়সালা করুন। তার প্রতিপক্ষও দাঁড়িয়ে বললো: সে সত্য বলেছে। আপনি আমাদের মাঝে কোর‘আনের ফায়সালা করুন। তখন বেদুঈন ব্যক্তিটি বললো: আমার ছেলে এ লোকটির নিকট কামলা খাটতো। ইতিমধ্যে সে এর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করে বসে। সবাই আমাকে বললো: তোমার ছেলেটিকে পাথর মেরে হত্যা করতে হবে। তখন আমি আমার ছেলেটিকে ছাড়িয়ে নেই এ লোকটিকে একটি বান্দী ও একশটি ছাগল দিয়ে। অতঃপর অত্র এলাকার আলিমদেরকে জিজ্ঞাসা করলে তারা বললো, তোমার ছেলেকে একশটি বেত্রাঘাত ও এক বছরের জন্য দেশান্তর করতে হবে। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমাদের মাঝে কুরআনের বিচার করছি, বান্দী ও ছাগলগুলো তোমাকে ফেরত দেওয়া হবে এবং তোমার ছেলেটিকে একশটি বেত্রাঘাত ও এক বছরের জন্য দেশান্তর করতে হবে। আর হে উনাইস! তুমি এর স্ত্রীর নিকট যাও। অতঃপর তাকে রজম করো। অতএব, উনাইস তার নিকট গেলো। অতঃপর তাকে রজম করলো”। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৬৯৫, ২৬৯৬)

ইসলামি শরিয়াহতে ধর্ষণ একটি জঘন্যতম অপরাধ এবং এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ভুক্তভোগীকে কোনো দোষারোপ করা হয় না, বরং পূর্ণ সুরক্ষা প্রদান করা হয়। ইসলামি ইতিহাসে এমন অনেক নজির আছে যেখানে ধর্ষকদের কঠোর শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। পশ্চিমা ব্যবস্থায় যেখানে ধর্ষক মাত্র কয়েক বছরের সাজা পায় বা অর্থ-প্রভাব খাটিয়ে ছাড়া পেয়ে যায়, সেখানে ইসলামই প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে।
এপস্টাইন এবং তার মতো অপরাধীরা তাদের অর্থ-সম্পদের কারণে বিচারের ঊর্ধ্বে ছিল। ইসলামে যাকাত, সাদকা এবং উত্তরাধিকার আইনের মাধ্যমে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা হয়। কেউ এতটা ক্ষমতাশালী হতে পারে না যে আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে। খলিফা উমর (রা.) এর বিখ্যাত উক্তি: “একজন কপ্তিক খ্রিস্টান বালকও যদি মিশরে অত্যাচারিত হয়, আল্লাহ কিয়ামতের দিন উমরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।”

ইসলামি শরিয়াহতে ন্যায়বিচার সকলের জন্য সমান, ধনী-গরিব, শক্তিশালী-দুর্বল সবার জন্য একই আইন। খলিফা আলী (রা.) একজন ইহুদির বিরুদ্ধে মামলায় হেরে গিয়েছিলেন কারণ তার কাছে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছিল না। এটি প্রমাণ করে যে ইসলামি বিচার ব্যবস্থায় কোনো দ্বৈত মানদণ্ড নেই।
এপস্টাইনের যে কুকর্ম প্রকাশ পেয়েছে তা বিশাল হিমশৈলের ক্ষুদ্র একটি অংশ। এই ধরনের বিচারহীনতা এবং অনাচারের সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ইসলামী শরিয়াই একমাত্র সমাধান।

পর্দার আড়ালে কারা?
পুরো বিশ্ববাসী এবং সাধারণ মুসলিম উম্মাহ হয়তো ভাবছে যে সমস্ত অপরাধের জন্য শুধুমাত্র এই গোষ্ঠীটাই দায়ি যাদের তালিকা এপস্টাইন ফাইলে এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ডোনাল্ড ট্রাম্প রানিং প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় সে নিজেও নিজেকে রক্ষা করতে পারলো না। যাদের নাম এসেছে তারা সকলেই কোনো না কোনো স্তরের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, তবুও তারা এই নথিপত্রগুলোর প্রকাশ হওয়া রোধ করতে পারলো না। এই ঘটনা এটা স্পষ্ট করে দেয়, ক্ষমতার মসনদে যাদের দেখা যাচ্ছে তারা মূলত পুুতুল, তারা মূলত অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা এক অশুভশক্তির গোলাম, তারা মূলত পরাধীন, তারা চাইলেও গাযার গণহত্যা বন্ধ করতে পারে না কারণ তাদের লাগাম অন্য কেউ ধরে রেখেছে। এপস্টাইন ফাইলস প্রকাশ হওয়ার মাধ্যমে সেই পর্দার আড়ালের শক্তি যেন ক্ষমতার মসনদে বসে থাকা পাপেটগুলোকে সর্তক বার্তা দিলো যে তারা যেন ভুলেও নিজের প্রভুদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করে, করলেই তাদের ক্ষমতা সহ সবকিছুই কেড়ে নেওয়া। পর্দার আড়ালের সেই শক্তি হলো তারা যারা ইসলামকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়, যারা পুরো পৃথিবীতে একটি অভিন্ন ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যারা পৃথিবীতে একটি একক বিশ্ব ব্যবস্থা কায়েম করতে চায়, যারা দাজ্জালের আত্মপ্রকাশের জন্য তার মঞ্চ তৈরি করছে এবং দাজ্জালের সেনাবাহিনী প্রস্তুত করছে, যারা এক মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে যেটা ইমান ও কুফরের অস্তিত্ব রক্ষার চূড়ান্ত লড়াই হবে। এই শক্তি ইবলিসকে তাদের প্রভু হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে। আমেরিকা ও ইউরোপ এবং চীন ও রাশিয়া ভিত্তিক যে জোট নিজেদের মধ্যে ভিন্ন ফ্রন্টে লড়াইয়ে লিপ্ত সেখানে উভয় জোটই এই শক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো অবস্থান গ্রহণ করেনি। এই অশুভশক্তি গাযায় গণহত্যা চালাচ্ছে। তৈরি করছে এক যু্দ্ধের মঞ্চ।

উম্মাহর করণীয়
প্রিয় উম্মাহ, আঁধার যত ঘন হয়, মুক্তির আলো ততোই নিকটবর্তী হয়। উপমহাদেশে আজ ইসলাম নেই তবে কাল বা পরশু এই অঞ্চলে ইসলাম বিজয়ী হবেই ইনশাআল্লাহ। উপমহাদেশের কথিত পরাশক্তি ইন্ডিয়া খুবই নাজুক অবস্থায় আছে। শুধু সময় এবং সুযোগের অপেক্ষা, অচিরেই তার পতন ঘটবে, উত্থান হবে ইসলামের। গোমূত্র পানকারী মুশরিকরা আমাদের প্রতিরোধের মুখে মনোবল হারিয়ে ফেলবে। তাই উপমহাদেশে ইসলামের উত্থান শুধু সময়ের ব্যাপার। আমরা যত দ্রুত মুশরিকদের দূর্বলতাগুলো বুঝতে পারবো এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবো, ইসলামের বিজয় ততই সন্নিকটে চলে আসবে ইনশা আল্লাহ।

বাংলাদেশে একসময়ে ইসলামের প্রচার প্রসার খুব কঠিন ছিল। তখন নাস্তিক গ্রুপের ন্যারেটিভ সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে পরিবর্তন এসেছে। এমন এক প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে যারা ইসলামকে আঁকড়ে ধরতে চায়। ইসলামকে মধ্যযুগীয় ধর্ম বলে কটাক্ষ করা সেকুলারদের ন্যারেটিভ তারা ছুড়ে ফেলছে। এপস্টাইন ফাইলস প্রকাশিত হওয়ার পর আমেরিকা ও ইন্ডিয়ার মানবাধিকারের বয়ান এখন সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে এবং ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রাসঙ্গিক হয়েছে। তাই দায়ি ভাইদের উচিত হবে, ইসলামি খিলাফার ন্যারাটিভ সমাজে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা। তবেই এখানে ইসলামের বিজয়ের পথ প্রশস্ত হবে ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন।

سُبْحَانَكَ اللّٰهُمَّ وَبِحَمْدِكَ ، اَشْهَدُ اَنْ لَّا اِلٰهَ اِلَّا اَنْتَ اَسْتَغْفِرُكَ وَاَتُوْبُ اِلَيْكَ

– শাইখ আবু আব্দুল্লাহ আল হিন্দি (হাফিজাহুল্লাহ)
মুখপাত্র – জামা’আতুল মুজাহিদীন

পূর্ববর্তী পোস্ট

মন্তব্য

WORDPRESS: 0