জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১৩ দিনের গুরুত্ব, ফজীলত এবং করণীয় | Al Bayyinah Media

Homeকিতাব

জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১৩ দিনের গুরুত্ব, ফজীলত এবং করণীয় | Al Bayyinah Media

জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১৩ দিনের গুরুত্ব, ফজীলত এবং করণীয়

জিলকদ – ১৪৪৬ হিজরী

পরিবেশনায়: আল বাইয়্যিনাহ মিডিয়া

إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلاَ مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَلاَ هَادِيَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ أَمَّا بَعْدُ ‏

আল্লাহ তা‘আলা কিছু মাস, দিন ও রাতকে ফযীলতপূর্ণ করেছেন। যেমন রামাযান মাসকে অন্য সকল মাসের উপর মহিমান্বিত করেছেন। আরাফাতের দিন ও ঈদের দিনকে অন্য দিনের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। ক্বদরের রাতকে অন্যান্য রাতের চেয়ে মর্যাদামন্ডিত করেছেন। আসন্ন জিলহজ্জ মাস অনুরূপ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মাস। যে মাসে হজ্জ ও কুরবানী করা হয়ে থাকে। চারটি হারাম তথা সম্মানিত মাসের মধ্যে অন্যতম হ’ল জিলহজ্জ মাস। মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِنْدَ اللهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ، ‘

‘আসমান-যমীন সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর কিতাবে (লৌহ মাহফুজে) মাসগুলোর সংখ্যা হল বার। তার মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস। এটা হল সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন।’ [সূরা তওবা : ৩৬]

আবূ বাকরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেন,

الزَّمَانُ قَدِ اسْتَدَارَ كَهَيْئَتِهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ، السَّنَةُ اثْنَاعَشَرَ شَهْرًا، مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ، ثَلاَثَةٌ مُتَوَالِيَاتٌ ذُو الْقَعْدَةِ وَذُو الْحِجَّةِ وَالْمُحَرَّمُ، وَرَجَبُ مُضَرَ الَّذِى بَيْنَ جُمَادَى وَشَعْبَانَ،

‘আল্লাহ যেদিন আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, সেদিন হ’তে সময় যেভাবে আবর্তিত হচ্ছিল আজও তা সেভাবে আবর্তিত হচ্ছে। বারো মাসে এক বছর। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। যুল-কা‘দাহ, যুল-হিজ্জাহ ও মুহাররাম। তিনটি মাস পর পর রয়েছে। আর একটি মাস হ’ল রজব-ই মুযার, যা জুমাদা ও শা‘বান মাসের মাঝে অবস্থিত’। [বুখারী হা/৩১৯৭; মুসলিম হা/১৬৭৯; আবুদাঊদ হা/১৯৪৭]

এই মাসের প্রথম ১৩ দিনের ফযীলত ও আমল সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে বিস্তর আলোচনা এসেছে। আলোচ্য প্রবন্ধে জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১৩ দিনের ফযীলত ও আমল সম্পর্কে আলোচনা পেশ করা হ’ল।-

জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের ফযীলত :

জিলহজ্জ মাস পুরোটাই ফযীলতপূর্ণ হ’লেও প্রথম দশ দিনের বিশেষ ফযীলত রয়েছে। যেমন-

১. এই দিনগুলির আমল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়:

বিশিষ্ট সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«ما من أيام العمل الصالح فيهن أحب إلى الله من هذه الأيام العشر، فقالوا يا رسول الله، ولا الجهاد في سبيل الله ؟ فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم-: ولا الجهاد في سبيل الله، إلا رجل خرج بنفسه وماله فلم يرجع من ذلك بشيء.

জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনে নেক আমল করার মত অধিক প্রিয় আল্লাহর নিকট আর কোনো আমল নেই। তারা প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদ করাও কি তার চেয়ে প্রিয় নয়? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: না, আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে ঐ ব্যক্তির কথা আলাদা যে তার জান-মাল নিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদে বের হয়ে গেল অতঃপর তার প্রাণ ও সম্পদের কিছুই ফিরে এলো না। [বুখারি: ৯৬৯, তিরমিযি: ৭৫৭, মিশকাত হা/১৪৬০।]

অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

مَا مِنْ عَمَلٍ أَزْكَى عِنْدَ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ وَلاَ أَعْظَمَ أَجْراً مِنْ خَيْرٍ يَّعْمَلُهُ فِى عَشْرِ الأَضْحَى-

‘যেসব আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সর্বোত্তম মর্যাদা লাভ করা যায় জিলহজ্জ মাসের দশদিনের আমল তার অনুরূপ’। [ছহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব হা/১১৪৮; ইরওয়া ৩/৩৯৮।]

ইবনে ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নিকট কোনো দিন অধিক প্রিয় নয়, আর না তাতে আমল করা, এ দিনের তুলনায়। সুতরাং, তাতে তোমরা বেশি করে তাহলীল, তাকবীর ও তাহমীদ পাঠ কর। [তাবরানী ফীল মুজামিল কাবীর]

সাঈদ ইবনে জুবায়ের রাহিমাহুল্লাহর অভ্যাস ছিল, যখন জিলহজ্জ মাসরে ১ম দশ দিন প্রবেশ করত, তখন তিনি খুব মুজাহাদা করতেন, যেন তার উপর তিনি শক্তি হারিয়ে ফেলবেন। [দারামী: ২৫৬৪ হাসান সনদে]

২. এই দশ দিনে সকল মৌলিক ইবাদত একত্রিত হয়:

এই দশদিন আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত প্রায় সকল ইবাদত একত্রিত হয়, যা অন্য কোন সময়ে একত্রিত হওয়া সম্ভব নয়। যেমন হজ্জ, কুরবানী, ছালাত, ছিয়াম, দান-ছাদাক্বাসহ সকল ইবাদত এই দশ দিনে একত্রিত করা যায়। ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন,

وَالَّذِي يَظْهَرُ أَنَّ السَّبَبَ فِي امْتِيَازِ عَشْرِ ذِي الْحِجَّةِ لِمَكَانِ اجْتِمَاعِ أُمَّهَاتِ الْعِبَادَةِ فِيهِ وَهِيَ الصَّلَاةُ وَالصِّيَامُ وَالصَّدَقَةُ وَالْحَجُّ وَلَا يَتَأَتَّى ذَلِكَ فِي غَيْرِهِ

‘এ কথা স্পষ্ট হয় যে, যিলহজ্জের প্রথম দশ দিনের বিশেষ গুরুত্বের কারণ; যেহেতু ঐ দিনগুলিতে মৌলিক ইবাদতসমূহ একত্রিত হয়েছে। যেমন ছালাত, ছিয়াম, ছাদাক্বাহ এবং হজ্জ, যা অন্যান্য দিনগুলিতে এভাবে একত্রিত হয় না’। [ফাতহুল বারী ২/৪৬০।]

৩. নিদর্শনসমূহের সম্মানের সময়:

এই দশ দিনে যেহেতু ইসলামের মৌলিক ইবাদত একত্রিত হয়, সেহেতু আল্লাহর দ্বীনের নিদর্শন সমূহের সম্মান করাও সহজ হয়। মহান আল্লাহ বলেন,

ذَلِكَ وَمَنْ يُعَظِّم شَعَائِرَ اللهِ فَإِنَّهَا مِنْ تَقْوَى الْقُلُوبِ

‘এটাই হ’ল আল্লাহর বিধান, যে আল্লাহর নিদর্শন সমূহকে সম্মান করে, নিঃসন্দেহে তা অন্তরের তাক্বওয়া থেকেই’ [সূরা হজ্জ ২২/৩২]

আল্লাহর শি‘আর বা নিদর্শন বলতে বুঝায় এমন প্রতিটি বিষয় যাতে আল্লাহর কোন নির্দেশের চিহ্ন দেয়া আছে [কুরতুবী]। এগুলি আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের চিহ্ন। বিশেষ করে হজ্জের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়াদি, যেমন হজ্জের যাবতীয় কর্মকান্ড [কুরতুবী; সা‘দী]। হাদীর জন্য হাজীদের সঙ্গে নেয়া উট ইত্যাদি [ইবনে কাছীর]

ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, এখানে আল্লাহর নিদর্শন সম্মান করার দ্বারা হাদীর জন্তুটি মোটাতাযা ও সুন্দর হওয়া বোঝানো হয়েছে [ইবনে কাছীর]

৪. আল্লাহ এ দিনগুলোর শপথ করেছেন:

আল্লাহ তাআলা এই দিনগুলির শপথ করেছেন। আর কোন জিনিসের নামে শপথ তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্যেরই প্রমাণ। কারণ আল্লাহ অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ জিনিসেরই শপথ করে থাকেন । আল্লাহ পাক বলেন,

وَٱلۡفَجۡرِ ١ وَلَيَالٍ عَشۡر

‘শপথ ঊষার, শপথ দশ রজনীর’। [সূরা ফজর: ১-২]

ইবনে আব্বাস (রা.) ইবনে যুবাইর (রা.) ও প্রভৃতি সলফগণ বলেন, ‘নিশ্চয় ঐ দশ রাত্রি বলতে জিলহজ্জের দশ দিনকে বুঝানো হয়েছে।’ ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন, ‘এটাই সঠিক।’ শাওকানী (রহ.) বলেন, ‘এই অভিমত অধিকাংশ ব্যাখ্যাদাতাগণের।’ [তাফসীর ইবনে কাসীর, ফাতহুল কাদীর ৫/৪৩২]

৫. বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন:

জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

أَفْضَلُ أَيَّامِ الدُّنْيَا أَيَّامُ الْعَشْرِ

‘দুনিয়ার দিন সমূহের মধ্যে জিলহজ্জের প্রথম দশদিন সর্বোত্তম দিন’। [ছহীহুল জামে‘ হা/১১৩৩; ছহীহুত তারগীব হা/১১৫০।]

উলামায়ে কেরাম বলেছেন: জিলহজ্জ মাসরে ১ম দশদিন সর্বোত্তম দিন, আর রমযান মাসের শেষ দশ রাত, সব চেয়ে উত্তম রাত। [তাফসীর ইবনে কাসীর ৫/৪১২]

আরাফার দিনের ফযীলত:

জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হ’ল আরাফার দিন। এ দিনেরও বিশেষ ফযীলত রয়েছে।-

১. আল্লাহর দ্বীন ও নে‘মত পরিপূর্ণ হওয়ার দিন:

মহানবী (ছাঃ)-এর নবুঅতের শেষদিকে বিদায় হজ্জের সময় আরাফার দিন শুক্রবার আল্লাহ ইসলামকে পরিপূর্ণ দ্বীন হিসাবে ঘোষণা করেন। আল্লাহ বলেন,

الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا،

‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নে‘মতকে সম্পূর্ণ করলাম। আর ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম’ [সূরা মায়েদাহ: ৩]

ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রা.) থেকে বর্ণিত, জনৈক ইহূদী তাঁকে বলল, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনাদের কিতাবে একটি আয়াত আছে, যা আপনারা পাঠ করে থাকেন। তা যদি আমাদের ইহুদী জাতির উপর অবতীর্ণ হ’ত, তবে অবশ্যই আমরা সে দিনকে ঈদের দিন হিসাবে পালন করতাম। তিনি বললেন, কোন আয়াত? সে বলল, ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার নে‘মত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন মনোনীত করলাম’ ওমর (রা.) বললেন, এটি যে দিনে এবং যে স্থানে নবী করীম (ছাঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল তা আমরা জানি। তিনি সেদিন আরাফায় দাঁড়িয়েছিলেন আর সেটা ছিল জুম‘আর দিন’। [বুখারী হা/৪৫; মুসলিম হা/৩০১৭]

২. আল্লাহ এই দিনের কসম করেছেন : আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

الْيَوْمُ الْمَوْعُودُ يَوْمُ الْقِيَامَةِ وَالْيَوْمُ الْمَشْهُودُ يَوْمُ عَرَفَةَ وَالشَّاهِدُ يَوْمُ الْجُمُعَةِ،

‘আল-ইয়াউমুল মাও‘ঊদ’ (সূরা বুরূজ ৮৫/২) অর্থ-ক্বিয়ামতের দিন; ‘আল-ইয়াউমুল মাশহুদ’ (হূদ ১১/১০৩) অর্থ আরাফাতে (উপস্থিতির) দিন এবং ‘আশ্-শাহিদ’ (বুরূজ ৮৫/৩) অর্থ- জুম‘আর দিন’। [তিরমিযী হা/৩৩৩৯; ছহীহুল জামে‘ হা/৮২০১]

আল্লাহ বলেন, ‘শপথ জোড় ও বেজোড়ের’ (ফজর ৮৯/৩)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘বেজোড়-এর অর্থ আরাফা দিবস এবং জোড়-এর অর্থ ইয়াওমুন্নাহর (কুরবানী দিন)’। [আহমাদ হা/১৪৫৫১; ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা ফজর ৩ আয়াত।]

৩. এই দিন সবচেয়ে বেশী মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়া হয় : আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

مَا مِنْ يَوْمٍ أَكْثَرَ مِنْ أَنْ يُعْتِقَ اللهُ فِيهِ عَبْدًا مِنَ النَّارِ مِنْ يَوْمِ عَرَفَةَ وَإِنَّهُ لَيَدْنُو ثُمَّ يُبَاهِى بِهِمُ الْمَلاَئِكَةَ فَيَقُولُ مَا أَرَادَ هَؤُلاَءِ،

‘এমন কোন দিন নেই, যেদিন আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদেরকে আরাফার দিনের চেয়ে জাহান্নাম থেকে বেশি মুক্তি দিয়ে থাকেন। তিনি সেদিন বান্দাদের খুব নিকটবর্তী হন, তাদেরকে নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করে বলেন, এরা কি চায়? (অর্থাৎ তারা যা চায় আমি তাই দেব)। [মুসলিম হা/১৩৪৮; ইবনু মাজাহ ৩০১৪; ছহীহাহ হা/২৫৫১]

সুতরাং আমাদেরকে আরাফার দিনে বেশি বেশি জাহান্নাম থেকে পানাহ চাইতে হবে এবং দুয়া করতে হবে।

৪. এই দিন আল্লাহ ফেরেশতাদের কাছে তাঁর বান্দাদের নিয়ে গর্ব করেন : নবী করীম (ছাঃ) বলেন,

,إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يُبَاهِى مَلاَئِكَتَهُ عَشِيَّةَ عَرَفَةَ بِأَهْلِ عَرَفَةَ فَيَقُولُ انْظُرُوا إِلَى عِبَادِى أَتَوْنِى شُعْثاً غُبْراً.

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা আরাফার দিন বিকেলে আরাফায় অবস্থানকারী ব্যক্তিদের নিয়ে ফেরেশতাদের নিকট গর্ব করেন। অতঃপর বলেন, তোমরা আমার বান্দাদের দিকে লক্ষ্য কর, তারা আমার কাছে এসেছে মাথায় এলোমেলো চুল নিয়ে ধুলি মলিন অবস্থায়’। [আহমাদ হা/৮০৩৩; ছহীহুত তারগীব হা/১১৫৩; ছহীহুল জামে‘ হা/১৮৬৮]

৫. এই দিন মুসলমান হাজীদের ঈদ : এই মর্যাদাপূর্ণ দিন প্রত্যেক বছর মুসলমানদের মাঝে ফিরে আসে। এই দিন হাজীগণ আরাফার ময়দানে উপস্থিত হন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

يَوْمُ عَرَفَةَ وَيَوْمُ النَّحْرِ وَأَيَّامُ التَّشْرِيقِ عِيدُنَا أَهْلَ الإِسْلاَمِ وَهِىَ أَيَّامُ أَكْلٍ وَشُرْبٍ-

‘আমাদের মুসলিম জনগণের ঈদের দিন হচ্ছে আরাফার দিন, কুরবানীর দিন ও তাশ্রীকের দিন। এ দিনগুলি হচ্ছে পানাহারের দিন’। [আবু দাঊদ হা/২৪১৯; তিরমিযী হা/৭৭৩; নাসাঈ হা/২০০৪]

৬. আরাফার দো‘আ সবচেয়ে উত্তম দো‘আ :

নবী করীম (ছাঃ) বলেন,

,خَيْرُ الدُّعَاءِ دُعَاءُ يَوْمِ عَرَفَةَ وَخَيْرُ مَا قُلْتُ أَنَا وَالنَّبِيُّونَ مِنْ قَبْلِى لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ.

‘সকল দো‘আর শ্রেষ্ঠ দো‘আ হ’ল আরাফার দিনের দো‘আ। আর শ্রেষ্ঠ কালিমাহ (যিকর) যা আমি পাঠ করেছি ও আমার পূর্ববর্তী নবীগণ পাঠ করেছেন তা হ’ল, ‘লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হু ওয়াহদাহূ লা- শারীকা লাহূ লাহুল মুলকু, ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুওয়া ‘আলা- কুল্লি শাইয়িন ক্বদীর’। অর্থ- আল্লাহ ছাড়া কোন মা‘বূদ নেই। তিনি অদ্বিতীয়, তাঁর কোন শারীক নেই। তাঁরই রাজত্ব। তার জন্যই সকল প্রশংসা। তিনি সব কিছুর উপরে ক্ষমতাবান’। [তিরমিযী হা/৩৫৮৫; ছহীহাহ হা/১৫০৩; মিশকাত হা/২৫৯৮]

৭. এই দিনের ছিয়াম দুই বছরের গুনাহের কাফফারা:

কাতাদাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে আরাফা দিবসের ছিয়াম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হ’লে তিনি বলেন,

صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِى قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِى بَعْدَهُ،

‘আরাফা দিবসের ছিয়াম সম্পর্কে আল্লাহর কাছে আমি আশা করি যে, তা বিগত এক বছর ও আগত এক বছরের গোনাহের কাফফারা হবে’। [মুসলিম হা/১১৬২; আবুদাঊদহা/২৪২৫; মিশকাত হা/২০৪৪]

সাহল বিন সা‘দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,

مَنْ صَامَ عَرَفَةَ غُفِرَ لَهُ سَنَتَيْنِ مُتَتَابِعَتَيْنِ‘

যে ব্যক্তি আরাফার দিন ছিয়াম রাখে তার পরপর দুই বৎসরের পাপরাশি মাফ হয়ে যায়’। [ত্বাবারাণী হা/৫৭৯০; ছহীহুত তারগীব হা/১০১২]

কুরবানীর দিনের ফযীলত:

জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের শেষ দিন (১০ম দিন) হ’ল ইয়ামুন নাহার বা কুরবানীর দিন। এই দিনের বিশেষ ফযীলত ও গুরুত্ব রয়েছে। যেমন-

১. এটা হজ্জের বড় দিন:

ইবনু ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত,

أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَقَفَ يَوْمَ النَّحْرِ بَيْنَ الْجَمَرَاتِ فِى الْحَجَّةِ الَّتِى حَجَّ فَقَالَ أَىُّ يَوْمٍ هَذَا قَالُوا يَوْمُ النَّحْرِ قَالَ هَذَا يَوْمُ الْحَجِّ الأَكْبَر-

‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) (জিলহজ্জের ১০ তারিখ) নহরের দিন তিনটি জামরার মধ্যস্থলে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করেন, এটি কোন দিন? লোকেরা বলল, আজ কুরবানীর দিন। তিনি বললেন, আজ হজ্জের বড় দিন’। [আবুদাঊদ হা/১৯৪৫; ইবনু মাজাহ হা/৩০৫৮, সনদ ছহীহ]

২. এটি আল্লাহর নিকট মহান দিন:

নবী করীম (ছাঃ) বলেন,

إِنَّ أَعْظَمَ الأَيَّامِ عِنْدَ اللهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى يَوْمُ النَّحْرِ ثُمَّ يَوْمُ الْقَرِّ قَالَ ثَوْرٌ وَهُوَ الْيَوْمُ الثَّانِى- ‘

অবশ্যই কুরবানীর দিন আল্লাহর নিকট সবচেয়ে মহান দিন। অতঃপর ‘ক্বার্র’-এর দিন। ছাওর বলেন,‘ক্বার্র’ হল কুরবানীর দ্বিতীয় দিন’। [আবুদাঊদ হা/১৭৬৫; আহমাদ হা/১৯০৭৫; ইরওয়া হা/১৯৫৮]

উল্লেখ্য যে, অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন যে প্রথম দশক উত্তম নাকি রামাযানের শেষ দশক উত্তম। এই প্রশ্নের জবাবে ইবনু তায়মিয়া (৬৬১-৭২৮ হিঃ) (রহঃ) বলেন,

أَيَّامُ عَشْرِ ذِي الْحِجَّةِ أَفْضَلُ مِنْ أَيَّامِ الْعَشْرِ مِنْ رَمَضَانَ وَاللَّيَالِي الْعَشْرُ الْأَوَاخِرُ مِنْ رَمَضَانَ أَفْضَلُ مِنْ لَيَالِي عَشْرِ ذِي الْحِجَّةِ

‘জিলহজ্জের প্রথম দশকের দিনগুলি রামাযানের শেষ দশকের দিনগুলি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। আর রামাযানের শেষ দশকের রাতগুলি জিলহজ্জের প্রথম দশকের রাতগুলি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ’। [মাজমূ‘উল ফাতাওয়া (মদীনা: সঊদী আরব, বাদশাহ ফাহদ কুরআন মুদ্রণ কমপ্লেক্স, ১৪২৫ হিঃ/২০০৪ খ্রিঃ) ২৫/২৮৭]

ইবনু তাইমিয়া (রহঃ)-এর উক্তি প্রসঙ্গে ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, ‘এ উত্তর নিয়ে যদি কোন যোগ্য ও জ্ঞানী ব্যক্তি গভীরভাবে চিন্তা করেন, তাহ’লে তা সন্তোষজনক ও যথেষ্টরূপে পাবেন। যেহেতু দশ দিন ছাড়া অন্য কোন দিন নেই যার মধ্যে কৃত নেক আমল আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয় হ’তে পারে। তাছাড়া এতে রয়েছে আরাফার দিন, কুরবানী ও তারবিয়া (৮ই জিলহজ্জের) দিন। পক্ষান্তরে রামাযানের শেষ দশকের রাত্রিগুলি হ’ল জাগরণের রাত্রি। যে রাত্রিগুলিতে রাসূল (ছাঃ) রাত জেগে ইবাদত করতেন। আর তাতে রয়েছে এমন একটি রাত, যা হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ’। [যা-দুল মা‘আদ ১/৫৭]

আইয়ামুত তাশরীক এর ফযীলত:

আইয়ামুত তাশরীক হলো ঈদুল আযহার পরের তিনদিন। এ দিনগুলোর ফযিলত সম্পর্কে যে সকল বিষয় এসেছে তা নীচে আলোচনা করা হল:—

১। আইয়ামুত-তাশরীকের দিনগুলো ঈদের দিন হিসেবে গণ্য:

যেমন হাদিসে এসেছে—

عن عقبة بن عامر- رضي الله عنه- أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: «يوم عرفة، ويوم النحر، وأيام منى عيدنا أهل الإسلام، وهي أيام أكل وشرب» . [رواه أبو داود وصححه الألباني].

‘সাহাবি উকবাহ ইবনে আমের (রা.) থেকে বর্ণিত যে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আরাফাহ দিবস, কুরবানির দিন ও মিনার দিনসমূহ [কুরবানি পরবর্তী তিন দিন] আমাদের ইসলাম অনুসারীদের ঈদের দিন। [আবু দাউদ: ২৪১৩]

২। এ দিনসমূহ জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের সাথে লাগানো:

আইয়ামুত-তাশরীকের দিনসমূহ জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের সাথে লাগানো। যে দশক খুবই ফযিলত পূর্ণ। তাই এ কারণেও এর যথেষ্ট মর্যাদা রয়েছে।

৩। এ দিনগুলোতে হজ্জ এর কতিপয় আমল সম্পাদন করা হয়ে থাকে। এ কারণেও এ দিনগুলো ফযিলতের অধিকারী।

৪। দেহের নেয়ামত এবং মনের নেয়ামত তথা স্বাচ্ছন্দ্য একত্রীকরণ :

আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ فِيٓ أَيَّامٖ مَّعۡدُودَٰتٖۚ

‘তোমরা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ করবে। [সূরা বাকারাহ: ২০৩]

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বুখারি রহ. বলেন:—

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন—‘নির্দিষ্ট দিনগুলো বলতে আইয়ামুত-তাশরীককে বুঝানো হয়েছে।’

ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন: ইবনে আব্বাসের এ ব্যাখ্যা গ্রহণে কারো কোনো দ্বি-মত নেই। আর মূলত এ দিনগুলো হজের মওসুমে মিনাতে অবস্থানের দিন।

হাদীসে এসেছে,

عن نبيشة الهذلي أن رسول الله- صلى الله عليه وسلم- قال: «أيام التشريق أيام أكل وشرب وذكر الله. [رواه مسلم]

নাবীশা হাজালী থেকে বর্ণিত যে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘আইয়ামুত-তাশরীক হল খাওয়া-দাওয়া ও আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের যিকিরের দিন।’ [মুসলিম: ১১৪১]

ইমাম ইবনে রজব (রহ.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় চমৎকার কথা বলেছেন। তিনি বলেন: আইয়ামুত-তাশরীক এমন কতগুলো দিন যাতে ঈমানদারদের দেহের নেয়ামত ও স্বাচ্ছন্দ্য এবং মনের নেয়ামত তথা স্বাচ্ছন্দ্য একত্র করা হয়েছে। খাওয়া- দাওয়া হল দেহের খোরাক আর আল্লাহর জিকির ও শুকরিয়া হল হৃদয়ের খোরাক। আর এভাবেই নেয়ামতের পূর্ণতা লাভ করল এ দিনসমূহে।

৫। আল্লাহর নিকট মহান দিন : নবী করীম (ছাঃ) বলেন,

إِنَّ أَعْظَمَ الأَيَّامِ عِنْدَ اللهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى يَوْمُ النَّحْرِ ثُمَّ يَوْمُ الْقَرِّ قَالَ ثَوْرٌ وَهُوَ الْيَوْمُ الثَّانِى- ‘

অবশ্যই কুরবানীর দিন আল্লাহর নিকট সবচেয়ে মহান দিন। অতঃপর ‘ক্বার্র’-এর দিন। ছাওর বলেন,‘ক্বার্র’ হল কুরবানীর দ্বিতীয় দিন’। [আবুদাঊদ হা/১৭৬৫; আহমাদ হা/১৯০৭৫; ইরওয়া হা/১৯৫৮]

জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১৩ দিনের আমলসমূহ:

জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের আমলগুলিকে প্রধানত দু’ভাগে ভাগ করা যায়।

প্রথমতঃ আম বা সাধারণ ইবাদত। অর্থাৎ জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন বছরের অন্যান্য দিনের ন্যায় সকল নেক আমল করা। যেমন ছালাত, ছিয়াম, দান-ছাদাক্বাহ, দুয়া, কুরআন তেলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলীল, রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠ, পাপ থেকে তওবা করা ইত্যাদি। পাশাপাশি মুনকার বা নিষিদ্ধ কাজ করা থেকে বিরত থাকা। বিশিষ্ট সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«ما من أيام العمل الصالح فيهن أحب إلى الله من هذه الأيام العشر، فقالوا يا رسول الله، ولا الجهاد في سبيل الله ؟ فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم-: ولا الجهاد في سبيل الله، إلا رجل خرج بنفسه وماله فلم يرجع من ذلك بشيء. [رواه البخاري، والترمذي واللفظ له]

জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনে নেক আমল করার মত অধিক প্রিয় আল্লাহর নিকট আর কোনো আমল নেই। তারা প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদ করাও কি তার চেয়ে প্রিয় নয়? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: না, আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে ঐ ব্যক্তির কথা আলাদা যে তার জান-মাল নিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদে বের হয়ে গেল অতঃপর তার প্রাণ ও সম্পদের কিছুই ফিরে এলো না। [বুখারি: ৯৬৯, তিরমিযি: ৭৫৭]

সাঈদ ইবনে জুবায়ের রাহিমাহুল্লাহর অভ্যাস ছিল, যিনি পূর্বে বর্ণিত ইবনে আব্বাসরে হাদিস বর্ণনা করেছেন: যখন জিলহজ্জ মাসরে ১ম দশ দিন প্রবেশ করত, তখন তিনি খুব মুজাহাদা করতেন, যেন তার উপর তিনি শক্তি হারিয়ে ফেলবেন। [দারামী: ২৫৬৪ হাসান সনদে]

দ্বিতীয়তঃ খাছ বা বিশেষ ইবাদত। জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১৩ দিনের কিছু বিশেষ আমল রয়েছে। যেমন-

. ছিয়াম পালন করা :

জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের বিশেষ আমল হ’ল ছিয়াম পালন করা। নবী করীম (ছাঃ)-এর কোন স্ত্রী থেকে বর্ণিত যে,

,أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَصُومُ تِسْعًا مِنْ ذِى الْحِجَّةِ وَيَوْمَ عَاشُورَاءَ وَثَلاَثَةَ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ أَوَّلَ اثْنَيْنِ مِنَ الشَّهْرِ وَخَمِيسَيْنِ-

‘রাসূলুল্লাহ্ (ছাঃ) জিলহজ্জ মাসের নয় দিন, আশূরার দিন এবং প্রত্যেক মাসের তিন দিন, মাসের দুই সোমবার এবং বৃহস্পতিবার ছিয়াম পালন করতেন’ [সহীহ আবূ দাঊদ ২১২৯নং, নাসাঈ]

عن حفصة- رضي الله عنها- قالت: أربع لم يكن يدعهن النبي- صلى الله عليه وسلم-: صيام عاشوراء، والعشر، وثلاثة أيام من كل شهر والركعتين قبل الغداة . رواه أحمد، والنسائي صحيح سنن أبي داود، صحيح سنن النسائي

হাফসা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো চারটি আমল পরিত্যাগ করেননি। সেগুলো হল: আশুরার সওম, জিলহজ্জের দশ দিনের সওম, প্রত্যেক মাসে তিন দিনের সওম, ও ফযরের পূর্বের দুই রাকাত সালাত। [আহমদ: ৬/২৮৭, আবু দাউদ: ২১০৬, নাসায়ী: ২২৩৬]

জিলহজ্জ মাসের প্রথম নয় দিন ছিয়াম পালন করার গুরুত্ব থাকলেও আরাফাতের দিন ছিয়াম পালনের আলাদা বিশেষ ফযীলত রয়েছে। আর তা হ’ল বিগত ও আগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা। রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন,

صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَة الَّتِى قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِى بَعْدَهُ

‘আরাফা দিবসের ছিয়াম সম্পর্কে আল্লাহর কাছে আমি আশা করি যে, তা বিগত এক বছর ও আগত এক বছরের গোনাহের কাফফারা হবে’। [মুসলিম হা/১১৬২; আবুদাঊদহা/২৪২৫; মিশকাত হা/২০৪৪]

তবে আরাফার ময়দানে যে সকল হাজীরা অবস্থান করবে তারা এ দিন সিয়াম পালন করবে না।

حَدَّثَهُ أَنَّ عُمَيْرًا مَوْلَى ابْنِ عَبَّاسٍ – رضى الله عنهما – حَدَّثَهُ أَنَّهُ، سَمِعَ أُمَّ الْفَضْلِ، – رضى الله عنها – تَقُولُ شَكَّ نَاسٌ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي صِيَامِ يَوْمِ عَرَفَةَ وَنَحْنُ بِهَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَأَرْسَلْتُ إِلَيْهِ بِقَعْبٍ فِيهِ لَبَنٌ وَهُوَ بِعَرَفَةَ فَشَرِبَهُ ‏.‏

ইবনু আব্বাস (রাঃ) এর আযাদকৃত গোলাম উমায়র বর্ণনা করেন যে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রী মায়মুনা (রাঃ) কে বলতে শুনেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কতিপয় সাহাবা আরাফার দিন তাঁর সিয়াম পালনের ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করলেন। [উম্মুল ফাযল (রাঃ) বলেন] আমরাও সেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে ছিলাম। এ সময় আমি তাঁর নিকট এক পেয়ালা দুধ পাঠিয়ে দিলাম। তখন তিনি আরাফার ময়দানে ছিলেন। তিনি তা পান করে নিলেন। [সহীহ মুসলিম: ২৫০৬]

. হজ্জ পালন করা :

শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্যবান সকল মুসলিমের উপর জীবনে একবার হজ্জ ফরয। মহান আল্লাহ বলেন,

وَلِلّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلا وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ الله غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِين

আল্লাহর জন্য উক্ত ঘরের হাজ্জ করা লোকেদের উপর অবশ্য কর্তব্য যার সে পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য আছে। আর যে ব্যক্তি অস্বীকার করবে, (সে জেনে রাখুক) নিঃসন্দেহে আল্লাহ বিশ্ব জাহানের মুখাপেক্ষী নন। [সূরা আলে ইমরান: ৯৭]

একাধিকবার ও হজ্জ পালন করা যায়। হজ্জ পালনের জন্য প্রস্ত্ততি মূলক কয়েকটি মাস থাকলেও একমাত্র হজ্জের কার্যক্রম সম্পাদন করা হয় জিলহজ্জ মাসে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, لا ينبغي لأحد أن يحرم بالحج إلا في أشهر الحج، ‘হজ্জের মাস ছাড়া কারো হজ্জের ইহরাম বাঁধা উচিত নয়’। [তাফসীর ইবনে কাছীর, সূরা বাক্বারাহ ১৯৭ আয়াতের তাফসীর দ্রঃ।]

আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন

,لاَ يُحْرَمُ بِالْحَجِّ إِلاَّ فِى أَشْهُرِ الْحَجِّ. فَإِنَّ مِنْ سُنَّةِ الْحَجِّ أَنْ يُحَرَمَ بِالْحَجِّ فِى أَشْهُرِ الْحَجِّ.

‘হজ্জের মাসগুলি ছাড়া ইহরাম বাঁধা উচিত নয়। কারণ হজ্জের মাসগুলিতে ইহরাম বাঁধা হজ্জের সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত।

[ছহীহ ইবনু খুযাইমা হা/২৫৯৬; তাফসীর ইবনে কাছীর, সূরা বাক্বারাহ ১৯৭ নং আয়াতের তাফসীর দ্রঃ]

মহান আল্লাহ বলেন,

,الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَعْلُومَاتٌ فَمَنْ فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَجِّ،

‘হজ্জ হয় সুনির্দিষ্ট মাসসমূহে। অতএব এই মাসসমূহে যে হজ্জ করা স্থির করে নিল, তার জন্য হজ্জের সময় অশ্লীল ও পাপ কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়’ [সূরা বাক্বারাহ: ১৯৭]

. ঈদের ছালাত আদায় করা:

এই দশ দিনের অন্যতম আমল হ’ল ঈদুল আযহার দশম দিনে ঈদুল আযহর ছালাত আদায় করা। আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

كَانَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَخْرُجُ يَوْمَ الْفِطْرِ وَالأَضْحَى إِلَى الْمُصَلَّى، فَأَوَّلُ شَىْءٍ يَبْدَأُ بِهِ الصَّلاَةُ ثُمَّ يَنْصَرِفُ، فَيَقُومُ مُقَابِلَ النَّاسِ، وَالنَّاسُ جُلُوسٌ عَلَى صُفُوفِهِمْ، فَيَعِظُهُمْ وَيُوصِيهِمْ وَيَأْمُرُهُمْ، فَإِنْ كَانَ يُرِيدُ أَنْ يَقْطَعَ بَعْثًا قَطَعَهُ، أَوْ يَأْمُرَ بِشَىْءٍ أَمَرَ بِهِ، ثُمَّ يَنْصَرِفُ.

‘রাসূল (ছাঃ) ঈদুল ফিত্র ও ঈদুল আযহার দিন ঈদগাহে যেতেন এবং সেখানে তিনি প্রথম যে কাজ করতেন তাহ’ল ছালাত আদায়। আর ছালাত শেষ করে তিনি লোকদের দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন এবং তাঁরা কাতারে বসে থাকতেন। তিনি তাঁদের নছীহত করতেন, উপদেশ দিতেন এবং নির্দেশ দান করতেন। যদি তিনি কোন সেনাদল পাঠাবার ইচ্ছা করতেন, তবে তাদের আলাদা করে নিতেন। অথবা যদি কোন বিষয়ে নির্দেশ জারী করার ইচ্ছা করতেন তবে তা জারী করতেন। অতঃপর তিনি ফিরে যেতেন’। [বুখারী হা/৯৫৬]

উল্লেখ্য, মহিলারাও ঈদের ছালাতে পুরুষদের সাথে পর্দা সহকারে গমন করে ছালাত আদায় করবেন। এমনকি ঋতুবর্তীরাও ঈদগাহে যাবেন এবং দো‘আয় অংশগ্রহণ করবেন তথা খুৎবা শ্রবণ করবেন।

. কুরবানী করা :

জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের বিশেষ আরেকটি আমল হ’ল কুরবানী করা। হজ্জে তামাত্তু‘ ও হজ্জে ক্বিরানকারীগণ মিনা ও তার আশপাশ হারাম এলাকায় আর হজ্জের বাইরে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের মুসলমানরা তাদের স্ব স্ব অবস্থানস্থলে কুরবানী করেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

أُمِرْتُ بِيَوْمِ الْأَضْحَى، جَعَلَهُ اللهُ عِيدًا لِهَذِهِ الْأُمّةِ

আমাকে ‘ইয়াওমুল আযহা’র আদেশ করা হয়েছে (অর্থাৎ এ দিনে কুরবানী করার আদেশ করা হয়েছে); এ দিবসকে আল্লাহ তাআলা এ উম্মতের জন্য ঈদ বানিয়েছেন। [মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৬৫৭৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৫৯১৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৮৯; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৪৩৬৫]

কুরবানীর নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন,

,فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَر

‘তুমি তোমার রবের জন্য ছালাত আদায় কর এবং কুরবানী কর’ [সূরা কাওছার:২]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

,مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ وَلَمْ يُضَحِّ فَلاَ يَقْرَبَنَّ مُصَلاَّنَا، ‘

যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে’। [ইবনু মাজাহ হা/৩১২৩; ছহীহুল জামে‘ হা/৬৪৯০]

প্রত্যেক পরিবারের পক্ষ থেকে প্রত্যেক বছর একটি পশু দ্বারা কুরবানী করাই যখেষ্ট। তবে তাক্বওয়া সহকারে (হজ্জ ২২/৩৭) যে যত বেশী করবে তার তত ছওয়াব হবে।

. চুল ও নখ কর্তন না করা :

জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের আরেকটি আমল হ’ল জিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানী পর্যন্ত চুল ও নখ কর্তন না করা। রাসূল (ছাঃ) বলেন,

مَنْ رَأَى هِلاَلَ ذِى الْحِجَّةِ وَأَرَادَ أَنْ يُضَحِّىَ فَلاَ يَأْخُذَنَّ مِنْ شَعْرِهِ وَلاَ مِنْ أَظْفَارِهِ،

যে ব্যক্তি জিলহজ্জ মাসের নব চাঁদ দেখবে ও কুরবানী করার নিয়ত করবে, সে যেন নিজের চুল ও নিজের নখগুলি না কাটে। [মুসলিম হা/১৯৭৭; নাসাঈ হা/৪৩৬৪; মিশকাত হা/১৪৫৯]

إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّىَ فَلاَ يَمَسّ مِنْ شَعَرِهِ وَلاَ بَشَرِهِ شَيْئًا، وَفِي رِوَايَةٍ فَلاَ يَأْخُذَنَّ شَعْرًا وَلاَ يَقْلِمَنَّ ظُفُرًا،

‘তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা রাখলে, জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশক শুরু হয়ে গেলে সে যেন নিজের চুল ও চামড়ার কোন কিছু স্পর্শ না করে (না কাটে)। অন্য এক বর্ণনায় আছে, সে যেন কেশ ও নখ না কাটে। [মুসলিম হা/১৯৭৭; নাসাঈ হা/৪৩৬৪; মিশকাত হা/১৪৫৯]

ঈদের ছালাতের পর কুরবানী করে নখ ও চুল কাটতে পারবে।

রাসূল (ছাঃ) বলেন, যার কুরবানীর পশু রয়েছে, সে যেন জিলহজ্জ মাসের নতুন চাঁদ উঠার পর থেকে কুরবানী করার পূর্ব পর্যন্ত তার চুল ও নখ না কাটে। [মুসলিম হা/১৯৭৭; আবু দাউদ হা/২৭৯১; তিরমিযী হা/১৫২৩]

কুরবানী দিতে অক্ষম ব্যক্তি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইখলাছের সাথে এ আমল করে তাহ’লে ঐ ব্যক্তি কুরবানীর পূর্ণ ছওয়াব পাবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, আল্লাহ তা‘আলা কুরবানীর দিনকে এ উম্মতের জন্য ঈদ হিসাবে পরিগণিত করেছেন। এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমি যদি দুগ্ধবতী ছাগল ছাড়া অন্য কোন পশু না পাই তবে কি তা দিয়েই কুরবানী করব? তিনি বললেন,

لا وَلَكِنْ خُذ مِنْ شَعْرِكَ وَأَظْفَارِكَ وَتَقُصُّ شَارِبَكَ وَتَحْلِقُ عَانَتَكَ فَتِلْكَ تَمَامُ أُضْحِيَّتِكَ عِنْدَ اللهِ

না, তবে তুমি এ দিন তোমার চুল ও নখ কাটবে। তোমার গোঁফ কাটবে। নাভির নিচের পশম কাটবে। এটাই আল্লাহর নিকট তোমার পরিপূর্ণ কুরবানী’।

[আবুদাঊদ হা/২৭৮৯; নাসাঈ ৪৩৬৫। আলবানী একে যঈফ বলছেন। হাকেম একে ছহীহ বলেছেন ও যাহাবী তাকে সমর্থন করেছেন। শু‘আয়েব আরনাঊত্ব ‘হাসান’ বলেছেন।]

. তাকবীর পাঠ করা :

তাকবীর তথা আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করা এই দিনগুলির অন্যতম আমল।

মহান আল্লাহ বলেন ,

وَ لِتُکۡمِلُوا الۡعِدَّۃَ وَ لِتُکَبِّرُوا اللّٰهَ عَلٰی مَا هَدٰىکُمۡ وَ لَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡ

আর যাতে তোমরা সংখ্যা পূর্ণ কর এবং তিনি তোমাদেরকে যে হিদায়াত দিয়েছেন সে জন্য তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা কর এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। [সূরা বাকারা: ১৮৫]

তাকবীর পাঠের সময়সীমা দুই ধরনের হ’তে পারে।

প্রথমতঃ আম বা ব্যাপাক তাকবীর : জিলহজ্জ মাসের প্রথম তারিখ থেকে তের তারিখ পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করা।

ইবনু ওমর ও আবূ হুরায়রা (রাঃ) এই দশ দিন তাকবীর বলতে বলতে বাজারের দিকে যেতেন এবং তাদের তাকবীরের সঙ্গে অন্যরাও তাকবীর বলত। মুহাম্মাদ ইবনু আলী (রহঃ) নফল ছালাতের পরেও তাকবীর বলতেন। [বুখারী হা/৯৬৯-এর অনুচ্ছেদ দ্র.]

দ্বিতীয়তঃ নির্দিষ্ট দিনে তাকবীর : জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আছর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরয ছালাতের শেষে তাকবীর বলবে। [ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘উল ফাতাওয়া ২৪/২২০]

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) আরাফার দিন ফজর থেকে কুরবানীর দিন আছর পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করতেন। [শু‘আয়েব আরনাঊত্ব, যাদুল মা‘আদ ২/৩৬০]

তাকবীরের শব্দাবলী হল –

اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ

উচ্চারণ: ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াল্লা-হু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ’। [দারাকুৎণী হা/১৭৫৬; ইরওয়াউল গালীল ৩/১২৫ হা/৬৫৪]

কেননা হাদিসে তাকবির, তাহলীল ও ও তাহমিদের কথা এসেছে আর উল্লেখিত তাকবীরে এ সবগুলোই বিদ্যমান আছে।

হাদীসটি হল,

عن عبد الله بن عمر- رضى الله عنهما- عن النبى- صلى الله عليه وسلم- قال: «ما من أيام أعظم عند الله ولا أحب إليه من العمل فيهن من هذه العشر، فأكثروا فيهن من التهليل والتكبير والتحميد.[رواه أحمد، وقال أحمد شاكر:إسناده صحيح ]

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

এ দশ দিনে [নেক] আমল করার চেয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে অধিক প্রিয় ও মহান আর কোনো আমল নেই। তোমরা এ সময়ে তাহলীল [লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ] তাকবীর [আল্লাহু আকবার] তাহমীদ [আল-হামদুলিল্লাহ] বেশি করে আদায় কর। [আহমদ: ১৩২]

এ তাকবীর প্রকাশ্যে ও উচ্চস্বরে মসজিদ, বাড়ি-ঘর, রাস্তা-ঘাট, বাজার সহ সর্বত্র উচ্চ আওয়াজে পাঠ করা হবে। তবে মেয়েরা নিম্ন-স্বরে তাকবীর পাঠ করবে।

ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,

ইবনে ওমর মিনায় তার তাবুতে তাকবীর বলতেন, মসজিদের লোকেরা শুনত, অতঃপর তারা তাকবীর বলত এবং বাজারের লোকেরাও তাদের সাথে তাকবীর বলত। এক পর্যায়ে পুরো মিনা তাকবীর ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠত।

. বেশি বেশি জিকির করা :

আল্লাহকে স্মরণ করার জন্য বেশি বেশি জিকির করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,

لِّيَشۡهَدُواْ مَنَٰفِعَ لَهُمۡ وَيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ فِيٓ أَيَّامٖ مَّعۡلُومَٰتٍ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِۖ [الحج : ٢٨]

‘যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিজিক হিসেবে দান করেছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে।’ [সূরা হজ্জ আয়াত: ২৮]

যারা হজ্জে থাকবে তাদেরকেও আল্লাহ এই দিনগুলিতে জিকিরের নির্দেশ দিয়েছেন। বিশেষ করে আরাফার ময়দান থেকে ফিরে আসার পর। যেমন আল্লাহ বলেন,

فَإِذَا أَفَضْتُمْ مِنْ عَرَفَاتٍ فَاذْكُرُوا اللهَ عِنْدَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ وَاذْكُرُوهُ كَمَا هَدَاكُمْ

‘সুতরাং যখন তোমরা আরাফাত হ’তে ফিরে আসবে, তখন মাশ‘আরুল হারামের কাছে পৌঁছে আল্লাহকে স্মরণ করবে এবং তিনি যেভাবে শিক্ষা দিয়েছেন ঠিক সেভাবে তাঁকে স্মরণ করবে’ [সূরা বাক্বারাহ: ১৯৮]

. তাশরীকের দিনগুলোতেও খাওয়া – পান করা এবং জিকির আজকার করা:

আইয়ামে তাশরিকের দিনগুলো (জিলহজ্জ মাসের ১১,১২ ও ১৩ তারিখ) আল্লাহ তায়ালার দেওয়া নেয়ামত পূর্ণ রিজিক খাওয়া ও পান করার দিন।

হাদিসে এসেছে,

عن نبيشة الهذلي أن رسول الله- صلى الله عليه وسلم- قال: «أيام التشريق أيام أكل وشرب وذكر الله. » [رواه مسلم]

নাবীশা হাজালী থেকে বর্ণিত যে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘আইয়ামুত-তাশরীক হল খাওয়া-দাওয়া ও আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের যিকিরের দিন।’ [মুসলিম: ১১৪১]

তাই তাশরিকের দিনগুলোতে কোন প্রকারের সিয়াম পালন করা শুদ্ধ নয়। আর অভ্যাস মত যদিও এই দিনগুলোতে সিয়ামের দিন পড়ে তবুও তার পরবর্তী কোনো দিনে সিয়াম রেখে নিবে এবং এই দিনগুলোতে খাওয়া পান করার মাধ্যমে মহান আল্লাহর যিকির করবে। [লাতাইফুল মায়ারিফ- ৩৩৩ পৃষ্ঠা]

তবে যারা হজে গিয়ে কুরবানী দিতে অক্ষম হবে তারা তিনটি সিয়াম পালন করতে পারবে। [সহীহুল বুখারী: ১৮৯৮]

পাশাপাশি এ দিনগুলো ইবাদত-বন্দেগি, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জিকির ও তার শুকরিয়া আদায়ের দিন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:—

۞وَٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ فِيٓ أَيَّامٖ مَّعۡدُودَٰتٖۚ [البقرة: ٢٠٣]

‘তোমরা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ করবে।’ [সূরা বাকারা: ২০৩]

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বুখারি রহ. বলেন:—

عن أبن عباس رضى الله عنهما … الأيام المعدودات: أيام التشريق.

ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন—‘নির্দিষ্ট দিনগুলো বলতে আইয়ামুত-তাশরীককে বুঝানো হয়েছে।’ [বুখারী, কিতাবুল ইদাইন]

কিন্তু দুঃখজনক হলেও বাস্তব সত্য যে, এই দিনগুলোতে আনন্দ ফুর্তি করে তৃপ্তি সহকারে খাওয়া-দাওয়া করলেও আল্লাহর জিকির আজকার করা থেকে একেবারে আমাদের সমাজ গাফেল বরং খাওয়া দাওয়া হলেও জিকির-আজকারের কথা একেবারে ভুলে যাই । অবশ্যই এই অভ্যাস আমাদেরকে পরিত্যাগ করা উচিত এবং আল্লাহর রিজিক তৃপ্তি সহকারে খাওয়ার সাথে সাথে বেশি বেশি আল্লাহর জিকির আজকার করা উচিত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদেরকে জিলহজ মাসের প্রথম ১৩ দিনের গুরুত্ব ও ফজীলত অনুধাবন করার তৌফিক দান করুন। আর এই দিনগুলোর আম (অনির্দিষ্ট) ও খাস (নির্দিষ্ট) আমলগুলো পরিপূর্ণভাবে করার সুযোগ করে দিন। আমীন।

واخر دعوانا ان الحمد لله رب العالمین

COMMENTS

WORDPRESS: 0