তাক্বওয়া – শাইখ হাসান মাহমুদ (হাফিজাহুল্লাহ) | Insaf Media

Homeকিতাব

তাক্বওয়া – শাইখ হাসান মাহমুদ (হাফিজাহুল্লাহ) | Insaf Media

তাক্বওয়া

 

 

 

 

শাইখ হাসান মাহমুদ (হাফিজাহুল্লাহ)

 

 

 

 

 

পরিবেশনায়ঃ

ইনসাফ মিডিয়া

الحمد لله رب العلمين حمدا كثيرا طيبا مباركا فيه واشهد ان الا اله الا الله وحده لا شريك له واشهد ان محمدا عبده ورسوله

তাক্বওয়া কি

আভিধানিক অর্থে তাক্বওয়াঃ

অভিধানে উল্লেখিত তাক্বওয়ার মূল অর্থ হলো (قلة الكلام) তথা কম কথা বলা। এ থেকেই বলা হয় (التقي ملجم) অর্থাৎ মুত্তাক্বী ব্যক্তি নিয়ন্ত্রিত। এখানে উদ্দিষ্ট (التقوى) তাক্বওয়া শব্দটি (الاتقاء) আল-ইত্তিকা’উ মাসদার (جعلك حاجزا بينك وبين ما تكره الاتقاء) অর্থাৎ আপনার ও আপনার অপছন্দনীয় বিষয়াবলির মাঝে আপনার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি।

পারিভাষিক অর্থে তাক্বওয়াঃ

আলিমগণ তাক্বওয়ার পারিভাষিক অর্থ বর্ণনায় অনেক সংজ্ঞাই প্রদান করেছেন। তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো।

ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:

التَّقْوَى : فِعْلُ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ وَتَرْكُ مَا نَهَى اللَّهُ عَنْهُ

‘আল্লাহর নির্দেশিত কাজ করা এবং তাঁর নিষিদ্ধ কর্ম বর্জন করার নাম তাক্বওয়া।

ইবনে কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:

‘তাক্বওয়ার মূল কথা হলো, ইমানের সাথে সাওয়াবের প্রত্যাশী হয়ে আল্লাহর আনুগত্য করা। আদেশ-নিষেধগুলো পালন করা। আদেশদাতা আল্লাহর প্রতি ইমান এনে ও তাঁর ওয়াদাকে সত্যায়ন করে আদিষ্ট বিধান পালন করা এবং নিষেধকারী আল্লাহর প্রতি ইমান এনে ও তাঁর শাস্তির ধমককে ভয় করে নিষিদ্ধ কর্ম পরিত্যাগ করা।

যেমন তালক বিন হাবিব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যখন ফিতনা সংঘটিত হয়, তখন তাকে তাক্বওয়ার মাধ্যমে নির্বাপিত করো।’ বলা হলো, ‘তাক্বওয়া কী?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর আলোয় আলোকপ্রাপ্ত হয়ে তাঁর আনুগত্যে তোমার আমল করা, আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কারপ্রাপ্তির আশা রাখা। আল্লাহর রঙে রঙিন হয়ে তাঁর অবাধ্যতা পরিহার করা, তাঁর শাস্তির ভয় করা।

তাক্বওয়ার সংজ্ঞার ক্ষেত্রে এটি উৎকৃষ্টতম একটি সংজ্ঞা। ইবনে রজব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:

“তাক্বওয়ার মূল কথা হলো, মুমিন বান্দা নিজেকে ভীত করে এমন বস্তুর মাঝে এবং তার মাঝে রক্ষাকারী একটি দেয়াল দাঁড় করাবে।”

ইবনে কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:

“ইবাদতে অনুগত হওয়া এবং নিষিদ্ধ কর্ম থেকে বিরত থাকার নাম তাক্বওয়া।”

উমর বিন খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও উবাই বিন কাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) -এর আলোচনা:

উমর বিন খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) উবাই বিন কাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে তাক্বওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। উবাই (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, ‘আপনি কি কখনো কাঁটাযুক্ত পথ দিয়ে হাঁটেন?’ তিনি উত্তর করলেন, ‘হ্যাঁ।’ উবাই (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, ‘তখন আপনি কী করেন?’ উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, ‘আমি কাপড় গুটিয়ে নিই এবং সাবধানতা অবলম্বন করি।’ উবাই রা. বললেন, ‘এটাই তাক্বওয়া।

তাক্বওয়ার ব্যাপারে আরও বলা হয়:

“নিষিদ্ধ কর্মে তোমাকে লিপ্ত না দেখা এবং আদিষ্ট কর্ম থেকে তোমাকে দূরে না দেখা হলো তাক্বওয়া।”

তাক্বওয়ার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

কুরআনের পরতে পরতে তাক্বওয়া অর্জনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন বলেন,

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ حَقَّ تُقٰتِہٖ وَلَا تَمُوۡتُنَّ اِلَّا وَاَنۡتُمۡ مُّسۡلِمُوۡنَ

অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। {সূরা আল ইমরানঃ ১০২}

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ وَلۡتَنۡظُرۡ نَفۡسٌ مَّا قَدَّمَتۡ لِغَدٍ ۚ وَاتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ

অর্থঃ মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ তা’আলাকে ভয় কর। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামী কালের জন্যে সে কি প্রেরণ করে, তা চিন্তা করা। আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করতে থাক। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা’আলা সে সম্পর্কে খবর রাখেন। {সূরা আল-হাশরঃ ১৮}

তাকওয়ার বার্তা নিয়ে প্রতিবছর মাহে রমজান আসে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُتِبَ عَلَیۡکُمُ الصِّیَامُ کَمَا کُتِبَ عَلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ ۙ

অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার। {সূরা আল বাকারাঃ ১৮৩}

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ‏:‏ لاَ أَرَى أَحَدًا يَعْمَلُ بِهَذِهِ الْآيَةِ‏:‏ ‏(‏يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى‏)‏ حَتَّى بَلَغَ‏:‏ ‏(‏إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللهِ أَتْقَاكُمْ‏)‏، فَيَقُولُ الرَّجُلُ لِلرَّجُلِ‏:‏ أَنَا أَكْرَمُ مِنْكَ، فَلَيْسَ أَحَدٌ أَكْرَمَ مِنْ أَحَدٍ إِلا بِتَقْوَى اللهِ‏

ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমার মতে কোন ব্যক্তি নিম্নোক্ত আয়াত অনুযায়ী আচরণ করে না (অনুবাদঃ) “হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারীর সমন্বয়ে সৃষ্টি করেছি….. নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট সবচাইতে সম্ভ্রান্ত সেই ব্যক্তি যে তোমাদের মধ্যে সবচাইতে বেশী আল্লাহভীরু” (সূরা হুজুরাতঃ ১৩)। আল্লাহর এই বাণী বিদ্যমান থাকা সত্বেও এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে বলবে, আমি তোমার চেয়ে অধিক সম্ভ্রান্ত। অথচ তাকওয়া ব্যতীত কেউ কারো চেয়ে অধিক সম্ভ্রান্ত হতে পারে না। {আল আদাবুল মুফরাদ হাদিস নং ৯০৬}

মূলত তাক্বওয়া অন্তরের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। সহজ বাংলায় বলা হয় আল্লাহভীতি। তাক্বওয়া হচ্ছে সব ভালো কাজের উৎস, পুণ্য কাজের জন্য পথের দিশারি। তাক্বওয়া হচ্ছে ভালো কাজের মাধ্যমে আল্লাহর আজাব থেকে বেঁচে থাকা। আগের ও পরের সব উম্মতকে তাক্বওয়া অর্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

وَلِلّٰہِ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَمَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ وَلَقَدۡ وَصَّیۡنَا الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡکِتٰبَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ وَاِیَّاکُمۡ اَنِ اتَّقُوا اللّٰہَ

অর্থঃ আর যা কিছু রয়েছে আসমান সমূহে ও যমীনে সবই আল্লাহর। বস্তুতঃ আমি নির্দেশ দিয়েছি তোমাদের পূর্ববর্তী গ্রন্থের অধিকারীদেরকে এবং তোমাদেরকে যে, তোমরা সবাই ভয় করতে থাক আল্লাহকে। {সূরা আন নিসাঃ ১৩১}

তাক্বওয়ার তিনটি স্তর

  • অন্তর ও সব অঙ্গ গুনাহ ও হারাম কাজ থেকে বাঁচিয়ে রাখা।
  • ঘৃণিত কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা।
  • অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় বিষয় থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা।

তাক্বওয়ার উপকারিতা

এ সম্পর্কে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন বলেন,

اِنَّ لِلۡمُتَّقِیۡنَ مَفَازًا 

অর্থঃ পরহেযগারদের জন্যে রয়েছে সাফল্য। {সূরা আন নাবাঃ ৩১}

وَلِمَنۡ خَافَ مَقَامَ رَبِّہٖ جَنَّتٰنِ 

অর্থঃ যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে পেশ হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্যে রয়েছে দু’টি উদ্যান। {সূরা আর রাহমানঃ ৪৬}

اِنَّ اَکۡرَمَکُمۡ عِنۡدَ اللّٰہِ اَتۡقٰکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَلِیۡمٌ خَبِیۡرٌ

অর্থঃ নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন। {সূরা আল হুজুরাতঃ ১৩}

সুতরাং তাক্বওয়ার মাধ্যমে

  • আল্লাহর সাহায্য ও নৈকট্য পাওয়া যায়।
  • শেষ পরিণাম ভালো হয়।
  • উত্তম প্রতিদান পাওয়া যায়।
  • সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
  • দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জিত হয়।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে প্রকৃত তাক্বওয়া অর্জনের তৌফিক্ব দান করুন।

سُبْحَانَكَ اللّٰهُمَّ وَبِحَمْدِكَ اَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ اَسْتَغْفِرُكَ وَاَتُوْبُ اِلَيْكَ

COMMENTS

WORDPRESS: 0