ইখলাস
শাইখ হাসান মাহমুদ হাফিজাহুল্লাহ
পরিবেশনায়ঃ–
ইনসাফ মিডিয়া
الحمد لله رب العلمين حمدا كثيرا طيبا مباركا فيه واشهد ان الا اله الا الله وحده لا شريك له واشهد ان محمدا عبده ورسوله
প্রত্যেকটি আমল কবুল হওয়ার জন্য ২ টি শর্ত রয়েছে। প্রথমটি হলো ইখলাস এবং দ্বিতীয়টি হলো সুন্নাহ। এগুলোর মধ্যে কোনো একটি যদি আমাদের আমলে অনুপস্থিত থাকে তবে আল্লাহর নিকট আমাদের কোনো আমল কবুল হবে না যদিও বা সেটি পরিমাণে অনেক বেশি হয়। তাই ইখলাস এবং সুন্নাহ এর বিকল্প আর অন্য কিছু নেই। তবে ইখলাস এবং সুন্নাহকে আমরা নিজেদের আমলে তখনই সংযুক্ত করতে পারবো যখন এগুলো সম্পর্কে আমাদের যথেষ্ট ইলম থাকবে। যদি কোনটা ইখলাস এবং কোনটা সুন্নাহ এগুলোই আমরা সঠিকভাবে না জানি তবে আমাদের আমল কবুল হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তাই এই আলোচনায় আমরা সংক্ষিপ্ত আকারে ইখলাস সম্পর্কে জানবো ইনশা-আল্লাহ্।
ইখলাস কি?
ইখলাস শব্দটি আভিধানিক অর্থে أخلص ক্রিয়া থেকে উদগত। এ শব্দের مضارع- এর রূপটি হলো يُخلِص। মাসদার: إخلاصاً অর্থ: “সবচেয়ে নিরেট বস্তু” কোনো কিছু খাঁটি হওয়া ও তার সাথে অন্য কিছুর মিশ্রণ না ঘটার নাম ইখলাস। যেমন আরবীতে বলা হয়ে থাকে, وأخلص الرجل دينه الله
দ্বীনকে কেবল আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট করলো এবং স্বীয় দ্বীনের সাথে অন্য কোনো সত্তাকে অংশীদার করেনি।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ
“তাদের মধ্য থেকে আপনার বিশেষ বান্দাগণ ব্যতীত” (সুরা আল-হিজর: ৪০)
الْمُخْلَصِينَ শব্দকে অন্য কিরাআতে الْمُخْلِصِينَ তথা লামের নিচে জের দিয়ে পড়া হয়।
সালাব (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: লাম হরফের নিচে জের সহ ( مُخلِصِينَ ) হচ্ছেন সেসব মুমিন, যারা শুধু আল্লাহর জন্যই ইবাদত করে থাকেন। আর লাম হরফের ওপর জবর সহ ( مُخلَصِينَ ) হচ্ছেন সেসব মুমিন, যাদেরকে আল্লাহ বিশেষভাবে বাছাই করেছেন।
ইবনে আসির (রহিমাহুল্লাহ) সূরা ইখলাসের নামকরণ সম্পর্কে বলেন:
“এ সূরাকে ইখলাস নামে নামকরণের কারণ-সূরাটি আল্লাহ তাআলার গুণাবলি ও পবিত্রতা বর্ণনার দিক থেকে পরিশুদ্ধ। অথবা নামকরণের কারণ হলো, এ সূরা তিলাওয়াতকারী নিজের অন্তরে আল্লাহর একত্ববাদ বিশুদ্ধ করে নেয়।” এ জন্যই “কালিমাতুল ইখলাস” এর অপর নাম “কালিমাতুত তাওহিদ”।
পারিভাষিক অর্থে ইখলাসকে আলিমগণ বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তন্মধ্যে কয়েকটি হলো:
★ ইবনুল কাইয়্যিম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
“একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে ইবাদত করার নাম ইখলাস।”
★ হুজাইফা মারআশি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
“একজন মুসলিমের প্রকাশ্য ও গোপন উভয় আমল সমান সমান হওয়ার নাম ইখলাস।”
★ কতিপয় আলিম বলেন:
“আল্লাহ ব্যতীত অন্য সকলকে বাদ দিয়ে তুমি তোমার আমলে একমাত্র আল্লাহকেই দর্শক ও সাক্ষী হিসাবে চাইবে, এটাই হলো ইখলাস।”
সালাফে সালিহিন ইখলাসের অনেক অর্থই পেশ করেছেন। তন্মধ্যে কয়েকটি হলো:
আমলটি একমাত্র আল্লাহ তা’আলার জন্য হবে। সে আমলে অন্য কারও কোনো অংশ থাকবে না। মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ থেকে আমলটি মুক্ত হবে। আমলটি প্রত্যেক সম্ভাব্য মিশ্রণ থেকে মুক্ত হবে।
সুতরাং (مُخْلِص) মুখলিস হলেন তিনি, যিনি আল্লাহর উদ্দেশ্যে আমল করার ক্ষেত্রে অন্তরের শুদ্ধতার অধিকারী হন। এমনকি তার আমল সম্পর্কে মানুষের অন্তরে থাকা সম্মানের প্রতিটি ফোঁটাকেও যদি বের করে ফেলা হয়; তবুও তা তার কাছে কোনো ব্যাপারই মনে হয় না। তাঁর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, মানুষ তার অণু পরিমাণ আমলও জানুক, তিনি তা পছন্দ করেন না।
ইবাদত-বন্দেগিসহ যে কোনো ভালো কাজের জন্যই ইখলাস বা একনিষ্ঠতার গুরুত্ব অনেক বেশি। যে কোনো কাজেই ইখলাস না থাকলে সে কাজ মূল্যহীন। কারণ মানুষের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য তথা ভেতরে ও বাহিরের কাজে মিল থাকার নামই ইখলাস। সে কারণেই ছোট কিংবা বড়, কম-বেশি আমল-ইবাদতে মিল থাকলেই কেবল মিলবে বরকত। হাদিসের বর্ণনায় তা সুস্পষ্ট-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
عَنْ أَبِيْ مُوْسَى قَالَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ الرَّجُلُ يُقَاتِلُ لِلْمَغْنَمِ وَالرَّجُلُ يُقَاتِلُ لِلذِّكْرِ وَالرَّجُلُ يُقَاتِلُ لِيُرَى مَكَانُهُ فَمَنْ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ قَالَ مَنْ قَاتَلَ لِتَكُوْنَ كَلِمَةُ اللهِ هِيَ الْعُلْيَا فَهُوَ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ
আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট এসে বলল, এক ব্যক্তি গনীমতের জন্য, এক ব্যক্তি প্রসিদ্ধ হওয়ার জন্য এবং এক ব্যক্তি বীরত্ব দেখানোর জন্য জিহাদে শরীক হলো। তাদের মধ্যে কে আল্লাহর পথে জিহাদ করল? তিনি বললেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর কলিমা বুলন্দ থাকার উদ্দেশে যুদ্ধ করল, সে-ই আল্লাহর পথে জিহাদ করল।”
(সহিহ বুখারী তাওঃ পাবঃ হাঃ নং ২৮১০)
আমল-ইবাদত বা যে কোনো ভালো কাজ দ্বারা আল্লাহ তা’আলাকে খুশি করানোর জন্য বেশি আমলের প্রয়োজন নেই। বরং আমল কম হোক কিন্তু তাতে ইখলাস বা একনিষ্ঠতার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। ইখলাস বা একনিষ্ঠতা থাকলেই কেবল মিলবে বরকতময় আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর ইখলাস না থাকলে সব আমলই হবে মূল্যহীন।
একনিষ্ঠতার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশী এ কারণে মহান আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমের একাধিক আয়াতে খাঁটি মনে ইখলাস বা একনিষ্ঠতার সঙ্গে ইবাদত-বন্দেগি করার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাহলো-
وَمَاۤ اُمِرُوۡۤا اِلَّا لِیَعۡبُدُوا اللّٰہَ مُخۡلِصِیۡنَ لَہُ الدِّیۡنَ ۬ۙ حُنَفَآءَ وَیُقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَیُؤۡتُوا الزَّکٰوۃَ وَذٰلِکَ دِیۡنُ الۡقَیِّمَۃِ ؕ
অর্থঃ তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর এবাদত করবে, নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। এটাই সঠিক ধর্ম। (সূরা বাইয়্যিনাহ: ৫)
اَلَا لِلّٰہِ الدِّیۡنُ الۡخَالِصُ
অর্থঃ জেনে রাখুন, নিষ্ঠাপূর্ণ এবাদত আল্লাহরই নিমিত্ত। (সূরা আয্-যুমার: ৩)
الَّذِیۡ خَلَقَ الۡمَوۡتَ وَالۡحَیٰوۃَ لِیَبۡلُوَکُمۡ اَیُّکُمۡ اَحۡسَنُ عَمَلًا ؕ وَہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡغَفُوۡرُ ۙ
অর্থঃ যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন-কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাময়। (সূরা আল-মুলক: ২)
সুতরাং ইখলাস বা একনিষ্ঠতা কী?
শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে ইবাদতসহ যাবতীয় কাজ (একনিষ্ঠতার সঙ্গে) সম্পাদন করার নামই ইখলাস। ইবাদতসহ সব কাজে- কে আমাকে দেখছে, আর কে দেখছে না; সেটা না ভেবে বরং সর্বক্ষণ প্রতিটি মুহূর্তে মহান আল্লাহ তা’আলা আমাকে দেখছেন- এই ভয় ও ভাবনা মাথায় রেখে ইবাদত-বন্দেগি ও কাজ করার নামই ইখলাস বা একনিষ্ঠতা।
এ সম্পর্কে হাদীসে জিবরীলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
«أَنْ تَعْبُدَ اللهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّه يَرَاكَ»
“আপনি এমনভাবে আল্লাহর ‘ইবাদাত করবেন যেন আপনি তাঁকে দেখছেন, আর যদি আপনি তাঁকে দেখতে না পান তবে (মনে করবেন) তিনি আপনাকে দেখছেন।” (সহিহ বুখারী তাওঃ পাবঃ হাঃ নং ৫০)
ইখলাস বা একনিষ্ঠতার বরকত যে অনেক বেশি তা প্রমাণ করতেই ইমাম বুখারী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ বুখারির প্রথম হাদিসেই জানিয়ে দিয়েছেন যে-
إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى
কাজ (এর প্রাপ্য হবে) নিয়্যাত (ইখলাস/একনিষ্ঠতা) অনুযায়ী। আর মানুষ তার নিয়্যাত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে।
তাই আসুন, আমরা যতটুকু সৎ আমল করবো তা যেন হয় ইখলাস অনুযায়ী। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিম উম্মাহকে ইখলাসের সঙ্গে ইবাদত করার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের সকলের সৎ আমল গুলো কবুল করুন। আমীন ইয়া রব্বাল আলামীন।
سُبْحَانَكَ اللّٰهُمَّ وَبِحَمْدِكَ اَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ اَسْتَغْفِرُكَ وَاَتُوْبُ اِلَيْكَ
COMMENTS