বিবৃতি | বাতিলের অন্তর্দ্বন্দ্ব: শিয়া ও ইহুদি সংঘাত, ভূরাজনৈতিক সংকট এবং উম্মাহর করণীয়

প্রচ্ছদবার্তা ও বিবৃতিফিচারড

বিবৃতি | বাতিলের অন্তর্দ্বন্দ্ব: শিয়া ও ইহুদি সংঘাত, ভূরাজনৈতিক সংকট এবং উম্মাহর করণীয়

Download for offline

যাবতীয় প্রশংসা সেই মহান সত্তার, যিনি আসমান ও জমিনের একমাত্র অধিপতি এবং সকল ক্ষমতার উৎস। অগণিত দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক মানবতার মুক্তির দিশারী, সায়্যিদুল মুরসালীন নবী মুহাম্মদ ﷺ এর ওপর, তাঁর পবিত্র পরিবার ও সম্মানিত সাহাবাগণের ওপর।

বর্তমান বিশ্ব এক চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। আমরা প্রতিনিয়ত ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাতের খবর গণমাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি। বাহ্যিকভাবে এটি দুটি রাষ্ট্রের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক যুদ্ধ মনে হলেও, নিখাদ ইসলামী আকীদা ও ইতিহাসের আলোকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মূলত বাতিলের দুই ভিন্ন রূপের মধ্যকার পারস্পরিক দ্বন্দ্ব। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন:

“وَكَذَٰلِكَ نُوَلِّي بَعْضَ الظَّالِمِينَ بَعْضًا بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ”
অর্থ: আর এভাবেই আমি জালিমদের একে অপরের ওপর চাপিয়ে দিই, তাদের কৃতকর্মের কারণে। [সূরা আল-আনআম, আয়াত ১২৯]

ইহুদিবাদের চরম ইসলাম বিদ্বেষ তো সর্বজনবিদিত এবং পবিত্র কুরআনে তাদের শত্রুতায় অগ্রগামী হওয়ার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু অপরপক্ষে যারা দাঁড়িয়ে আছে, সেই রাফেযি বা শিয়াদের ইতিহাসও আহলে সুন্নাহর জন্য চরম বেদনাদায়ক ও বিশ্বাসঘাতকতায় পরিপূর্ণ। ইসলামের ইতিহাসে যখনই ক্রান্তিকাল এসেছে, তখনই তাদের ভূমিকা ছিল ইসলামের শত্রুদের সহায়তাকারীর। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘মিনহাজুস সুন্নাহ আন নাবাওয়িয়্যাহ’ তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, রাফেযিরা সর্বদাই ইসলামের শত্রুদের সাথে হাত মিলিয়েছে।

অতীতের পাতা উল্টালে আমরা দেখি, বাগদাদে আব্বাসীয় খিলাফতের পতনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল শিয়া উজির ইবনুল আল কামির। সে তাতারীদের সাথে গোপন আঁতাত করে লাখ লাখ সুন্নি মুসলিমের রক্তবন্যার পথ সুগম করেছিল। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যখন সালাহউদ্দীন আইয়ুবী (রাহিমাহুল্লাহ) লড়ছিলেন, তখন ফাতেমী শিয়ারা পেছন থেকে বারবার খঞ্জর বিদ্ধ করেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। পরবর্তীতে উসমানীয় খিলাফত যখন ইউরোপের বুকে ইসলামের বিজয় নিশান উড্ডীন করছিল, তখন সাফাভী শিয়া সাম্রাজ্য ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের সাথে মিত্রতা করে উসমানীয়দের পেছন থেকে আক্রমণ করেছিল। তাই আধুনিক যুগেও বিভিন্ন রণাঙ্গনে(সিরিয়া, ইয়েমেন) আহলে সুন্নাহর বিপরীতে তাদের এই অবস্থান কোনো নতুন বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এই সংঘাত কোনোভাবেই ইসলামের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়; বরং এটি আমাদের দুই ঐতিহাসিক শত্রুর নিজেদের মধ্যকার আধিপত্য বিস্তারের লড়াই।

এই সংঘাতের একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে হরমুজ প্রণালী। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথটিকে কেন্দ্র করে যে পেশিশক্তির মহড়া চলছে, তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমাদের এই উপমহাদেশের ওপর। হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে এবং এর প্রত্যক্ষ শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের মতো দেশের সাধারণ মানুষ। দেশে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট দেখা দিচ্ছে। তীব্র লোডশেডিং এবং জ্বালানির অভাবে দেশের সার্বিক শিল্প উৎপাদন ও কলকারখানা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাতিলের এই আধিপত্য বিস্তারের খেলায় চরম মূল্য চোকাতে হচ্ছে আমাদের দেশের মজলুম জনতাকে।

এই সংকটের মুহূর্তে উম্মাহর জন্য সবচেয়ে লজ্জাজনক অধ্যায় হলো আরব বিশ্বের শাসকগোষ্ঠীর নগ্ন বিশ্বাসঘাতকতা। যে পবিত্র জাযিরাতুল আরব বা আরব উপদ্বীপ থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ মুশরিকদের বের করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন, আজ সেই পুণ্যভূমিতেই এই শাসকরা আমেরিকার বিশাল বিশাল সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করার সুযোগ করে দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর ইন্তেকালের পূর্বে সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন:

“أَخْرِجُوا الْمُشْرِكِينَ مِنْ جَزِيرَةِ الْعَرَبِ”
অর্থ: আরব উপদ্বীপ থেকে মুশরিকদের বের করে দাও। [সহীহ বুখারী, হাদিস ৩১৬৮]

অথচ আজকের আরব শাসকরা নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে পশ্চিমাদের দাসত্ব বরণ করেছে। তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে আমেরিকানরা নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে এবং মুসলিম উম্মাহর ওপর আধিপত্য বিস্তার করছে। এই শাসকরা মুমিনদের প্রতি ‘আল ওয়ালা ওয়াল বারা’ বা বন্ধুত্ব ও শত্রুতার ইসলামী মূলনীতি সম্পূর্ণরূপে বিসর্জন দিয়েছে। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ অমান্য করে কুফফার শক্তির সাথে মিত্রতা গড়ে তুলেছে, যা উম্মাহর জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

এমতাবস্থায় এই শিয়া এবং ইহুদি সংঘাতে এবং বৈশ্বিক এই পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের করণীয় যা হওয়া উচিত:

১. আকীদাগত স্পষ্টতা ও তাওহীদের ওপর অবিচলতা: সবার আগে আমাদেরকে তাওহীদ ও শিরকের মৌলিক পার্থক্য বুঝতে হবে এবং ‘আল ওয়ালা ওয়াল বারা’ এর নীতিতে অটল থাকতে হবে। কোনো সস্তা স্লোগান, আবেগ বা রাজনৈতিক চমকে বিভ্রান্ত হয়ে এক জালিমের বিরুদ্ধে অপর জালিমকে সমর্থন করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। হক এবং বাতিলের সীমারেখা মুমিনের কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট থাকতে হবে।

২. উভয়কে প্রত্যাখ্যান ও আল্লাহর কাছে ফায়সালার দোয়া: আমাদের নীতি হবে অত্যন্ত সুদৃঢ়। আমরা উভয় জালিম শক্তিকেই প্রত্যাখ্যান করি। আমরা মহান আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়া করব, তিনি যেন এক জালিমকে দিয়ে আরেক জালিমকে ধ্বংস করে দেন এবং উম্মাহকে তাদের উভয়ের অনিষ্ট থেকে পরিপূর্ণভাবে রক্ষা করেন। সালাফদের সেই সুপরিচিত দোয়াই আজ আমাদের পাথেয়:
“اللهم أهلك الظالمين بالظالمين وأخرجنا من بينهم سالمين”
হে আল্লাহ, জালিমদেরকে জালিমদের দ্বারাই ধ্বংস করুন এবং আমাদেরকে তাদের মধ্য থেকে নিরাপদে বের করে আনুন।

৩. নিজস্ব শক্তি ও স্বনির্ভরতা অর্জন: আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অনুসারীদের উচিত নিজেদের মধ্যকার সকল ছোটখাটো মতবিরোধ ভুলে বিশুদ্ধ তাওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। মুসলিম উম্মাহকে সামরিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে। জ্বালানিসহ মৌলিক প্রয়োজনগুলোর জন্য যেন হরমুজ প্রণালী বা অন্য কোনো ভূরাজনৈতিক পরাশক্তির খেয়ালখুশির ওপর আমাদের নির্ভর করতে না হয়, সেই লক্ষ্যে উম্মাহর চিন্তাশীল ব্যক্তি ও নেতৃবৃন্দকে সুদূরপ্রসারী কাজ করতে হবে।

মহান আল্লাহ আমাদের সঠিক বিষয়টি অনুধাবন করার তৌফিক দান করুন। তিনি আরব উপদ্বীপকে শত্রুদের অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করুন এবং উপমহাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের হেফাজত করুন। আমীন।

মন্তব্য

WORDPRESS: 0