রমাদ্বন: প্রস্তুতি ও করণীয়

প্রচ্ছদকিতাব

রমাদ্বন: প্রস্তুতি ও করণীয়

الحمد لله وحده والصلاة والسلام علي من لا نبي بعده

প্রতীক্ষিত মেহমান রমাদ্বনের আগমন, সর্বোত্তম পাথেয় আহরণের এটাই সুযোগ৷

যখন সারা বছর জুড়ে আমরা নিজেদের উপর অসংখ্য জুলুম করেছি, রবের নাফরমানী করেছি, গুনাহের পাল্লা ভারী করেছি এবং দ্বীন কায়েমের দায়িত্বে অবহেলা করেছি তখন এটাই আমাদের জন্য এক মোক্ষম সুযোগ, নিজেদের আমল সংশোধন করার, রবের আরোও নিকটবর্তী হওয়ার, গুনাহ থেকে বিরত থাকার এবং জিহাদের পথে দৃঢ় থাকার। যার মাধ্যমে তাক্বওয়া অর্জিত হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন-

وَتَزودُوا فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى وَاتَّقُونِ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ

“এবং তোমরা পাথেয়ের ব্যবস্থা করবে আর তাক্বওয়াই শ্রেষ্ঠ পাথেয়। আর আমাকেই ভয় করো, হে বুদ্ধিমানগণ!” [সূরা আল-বাকারাহ: ১৯৭]

এই তাক্বওয়া আহরণের জন্যই মূলত সিয়াম সাধনা ৷ আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়ামকে ফরয করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি ফরয করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পারো” [সূরা আল-বাকারাহ: ১৮৩]

হে প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোনেরা!

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেননি বরং তিনি আমাদেরকে তার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছেন, তিনি আমাদের এই হায়াতের সময় বেধে দিয়েছেন, এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই আমাদেরকে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করতে হবে৷ আমরা জানিনা কবে, কোথায় ও কিভাবে আমাদের জীবনের যাত্রা শেষ হয়ে যাবে। আমরা জানিনা পরবর্তী রমাদ্বনে আমরা উপস্থিত থাকতে পারবো কি না। আমরা জানিনা এর পরে আর কখনো রবের নিকট ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ হবে কি না। তাই এই রমাদ্বন মাস যেন কোনভাবেই আমাদের অবহেলায় কেটে না যায় সেই বিষয়ে আমাদেরকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে ইনশাআল্লাহ।

সিয়ামের ফজীলত:

রাসূলুল্লাহ সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

كل عمل ابن آدم يُضاعف الحسنة بعشر أمثالها إلى سبعمائة ضعف قال الله تعالى : إِلَّا الصَّوْمَ فإنه لي وأنا أجزى به

“মানব সন্তানের প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান দশ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে৷ আল্লাহ তা’আলা বলেন, কিন্তু সিয়ামের বিষয়টি ভিন্ন৷ কেননা সিয়াম শুধুমাত্র আমার জন্য, আমিই এর প্রতিদান দেব” [সহীহ : বুখারী ১৯০৪, মুসলিম ১১৫১]

অর্থাৎ কি পরিমাণ সংখ্যা দিয়ে গুণ করে এর প্রতিদান বাড়িয়ে দেয়া হবে এর কোন হিসাব নেই, আল্লাহই জানেন সিয়ামের সওয়াবের ভাণ্ডার কত সুবিশাল হবে৷ রাসূলুল্লাহ সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَمَ مِنْ ذَنْبِهِ

“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমাদ্বন মাসের রোযা রাখবে, তার পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে” [সহীহ: বুখারী ৩৮, ১৮০২, ১৯১০, ২০১৪, মুসলিম ৭৬০।] তিনি আরোও বলেন-

مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَمَ مِنْ ذَنْبِهِ

“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমাদ্বনের রাতে কিয়াম (রাতের স্বলাত আদায়) করে, তার পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়” [সহীহ:বুখারী ৩৮, ১৮০২, ১৯১০, ২০১৪, মুসলিম ৭৬০] তিনি আরোও বলেন-

منْ قَامَ لَيْلَةَ القَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَمَ مِنْ ذَنْبِهِ

“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় কদরের রাতে স্বলাতে দণ্ডায়মান হবে তার পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে” [সহীহ:বুখারী ৩৮, ১৮০২, ১৯১০, ২০১৪, মুসলিম ৭৬০]

উপর্যুক্ত হাদিসগুলো সুসংবাদ দিচ্ছে, রমাদ্বন মাসে বিগত জীবনের গুনাহসমূহের ক্ষমা পাওয়া সম্ভব সিয়াম পালন, কিয়ামুল লাইল ও লাইলাতুল কদরের কিয়ামের মাধ্যমে৷ তবে শর্ত হলো এই তিনটির সাথেই থাকতে হবে ইমান ও বিশুদ্ধ নিয়্যাত তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সওয়াবের প্রত্যাশা।

যাবতীয় বাজে কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে:

মনে রাখতে হবে, মুসলিম মাত্রই সিয়ামের বিধান মেনে নিতে বাধ্য। আর সিয়াম কেবল খাবার-পানীয় থেকে দূরে থাকার নাম নয়৷ যাবতীয় বাজে কথা ও কর্ম, মূর্খতা ও পাপাচার থেকেও অবশ্যই বিরত থাকতে হবে৷ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

من لم یدع قول الزور والعمل به و الجهل فلیس لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ

“যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ এবং মুর্খতা (ইলমহীন কথা-কর্ম) পরিত্যাগ করতে পারল না, তার সিয়াম পালনে শুধুমাত্র পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই” [সহীহ বুখারী : আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৭৬৮] তিনি আরোও বলেন-

إِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلَا يَرْقُتُ يَوْمَئِذٍ وَلَا يَصْحَبُ فَإِنْ شَاتَمَهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ فَلْيَقُلْ: إِنِّي امْرُؤْصَايم

“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সিয়াম পালন করবে সে যেন অশ্লীল আচরণ ও চেচামেচি করা থেকে বিরত থাকে৷ যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা তার সাথে লড়তে আসে (ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হয়) তবে সে যেন তাকে বলে ‘আমি সায়িম’ (অর্থাৎ সওম পালন অবস্থায় আমি গালিগালাজ ও মারামারি করতে পারি না)” [রিয়াজুস সলিহীন: ১২১৫] তিনি আরোও বলেন-

رُبَّ صَابِمٍ حَقِّهُ مِنْ صِيَامِهِ الجُوعُ وَالْعَطَشُ وَرُبَّ قَابِمٍ حَظِّهُ مِنْ قِيَامِهِ السَّهَرُ

“এমন অনেক সওম পালনকারী আছে যার সওম পালন থেকে প্রাপ্তি হচ্ছে শুধুমাত্র ক্ষুধা ও তৃষ্ণা৷ তেমনি কিছু কিয়ামকারী আছে যাদের কিয়ামে শুধু রাত জাগা ছাড়া কিছুই অর্জিত হচ্ছে না” [মুসনাদে আহমাদ] অর্থাৎ কিয়াম ও সিয়াম পালন সুন্নাত মোতাবেক না হওয়ার কারণে এবং বাজে কথা-কর্ম, মূর্খতা ও পাপাচার ত্যাগ না করায় তাদের সিয়াম ও কিয়াম কোনটাই কবুল হচ্ছে না৷

সুতরাং আমরা প্রতিজ্ঞা করবো:

১। মিথ্যা কথা, মিথ্যা গল্প-কৌতুক এসবে শরীক হব না অর্থাৎ নিজে করবো না, কাউকে করতে দেখলে তাকে সিয়ামের বিষয় স্মরণ করিয়ে দিয়ে চলে আসবো৷
২। গীবত-সমালোচনা, কারো অনুপস্থিতিতে তার ভুল-মন্দ নিয়ে কথা বলা, অন্যের সামনে তাকে অপমান-অসম্মান করা এসবের ধারের কাছেও যাবো না৷
৩। মজলিস জমানোর জন্য চাপাবাজি, নিজেকে বিভিন্ন বিষয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের চেষ্টা, কোনো কাজ না করেও ঐ বিষয়ে প্রশংসা পেতে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে গল্প উপস্থাপন, দাওয়াতি কাজে বা দল ভারী করতে জনতা বা সমর্থকদের মিথ্যা-অবাস্তব আশ্বাস দেয়া এসবের কোনটাই আমরা করবো না।
৪। কারো পক্ষে-বিপক্ষে কোন কিচ্ছা-কাহিনী, কথা বলা ও সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্বে আত্ম- জিজ্ঞাসায় লিপ্ত হবো, এটা কি আল্লাহর জন্য করতে যাচ্ছি নাকি অন্য কারো সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।
৫। সর্বোপরি আল্লাহর জন্য মন ও জিহ্বার নিয়ন্ত্রণ এ মাসে আমাদের প্রধানতম দায়িত্ব৷ আল্লাহ রব্বুল আলামীনের ঘোষণা,

وقُل لِعِبَادِي يَقُولُوا الَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنزَع بَيْنَهُمْ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلْإِنسَانِ عَدُوٌّا مبينا

“আমার বান্দাদেরকে বলে দিন, তারা যেন এমন কথাই বলে যা উত্তম৷ শয়তান তাদের মাঝে ঝগড়াবিভেদ-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে৷ নিশ্চয়ই শয়তান হল মানুষের প্রকাশ্য দুশমন” [সূরা বানী ইসরাইল: ৫৩] রাসূলুল্লাহ সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

من كانَ يُؤْمِنُ بِالله وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْلِيَصْمُتْ

“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের উপর ঈমান রাখে সে যেন কথা বললে ভাল কথা বলে নতুবা চুপ করে থাকে” [সহীহ বুখারী :৫৫৯৪] এই হাদীসের মর্মানুযায়ী ভাল কথাই বলতে হবে। আর ভাল কথা না থাকলে চুপ করে থাকা জরুরি৷

সম্মানিত মুসলিম ভাই ও বোনেরা! স্মরণ রাখবেন জিহ্বার হিফাজতের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হল-

অধিক পরিমাণে আল কুরআন তিলাওয়াত করা ও সর্বদা আল্লাহর যিকর-আজকারে মশগুল থাকা৷ কেননা বান্দা যখন আল্লাহকে স্মরণ করে আল্লাহ তার সঙ্গী হন, শয়তান তার ধারে কাছেও আসতে পারে না৷ সুতরাং যখনই সুযোগ পান কুরআন তিলাওয়াত করুন এবং সর্বদা আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকুন৷ আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاذْكُرُونِي أَذْكُرُكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ

“কাজেই তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করব এবং আমার শোকর করতে থাক, না-শোকরী করো না” [সূরা আল-বাকারাহ: ১৫২]

হাদিসে বর্ণিত কিছু উত্তম যিকর রয়েছে তা সর্বদা পাঠ করতে চেষ্টা করুন৷ সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি। এর প্রতি বাক্যের উপর ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ফজিলত বর্ণিত রয়েছে যা আমাদের প্রত্যেকের কম বেশি জানা আছে৷

যেভাবে শুরু করবেন রমাদ্বনের প্রস্তুতি গ্রহণ:

ক. রমাদ্বনের প্রারম্ভেই যথা সম্ভব প্রার্থিব কাজ কমিয়ে ফেলুন যাতে কাজের ব্যস্ততায় রমাদ্বনের ফজিলতপূর্ণ সময় অবহেলায় কেটে না যায়৷ মা-বোনেরাও যেনো রমাদ্বনের বারাকাহ থেকে বঞ্চিত না হন সে দিকে লক্ষ্য রাখুন৷ তাদেরকে আত্মশুদ্ধি এবং তাকওয়া অর্জনের নাসিহাহ প্রদান করুন। সাংসারিক কাজের ব্যাস্ততা যেনো রমাদ্বনের অপরিহার্য কাজ এবং ইবাদাত থেকে মহিলাদের দূরে সরিয়ে না রাখে সে দিকটা খেয়াল রাখুন৷ তাদের কাজগুলো হালকা করে দিন, অবসর সময়ে ঘরে অবস্থান কালে তাদের কাজে সাহায্য করুন৷
খ. রমাদ্বন সম্পর্কে বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করুন৷ পরিবারের সবাইকে নিয়ে রমাদ্বনের সিয়াম ও অন্যান্য ইবাদাতের মাসআলা মাসাইল আলোচনা করুন, এতে আপনি রমাদ্বনের ইবাদাতসমূহ সঠিকভাবে পালন করতে পারবেন ইনশাআল্লাহ, উৎসাহ ও অনুপ্রেরনা বৃদ্ধি পাবে৷ রমাদ্বন সম্বন্ধে আপনি যত বেশি জানবেন তত বেশি ইবাদাত করে আপনার প্রতিদানকে বহুগুণে বাড়িয়ে নিতে পারবেন ইনশাআল্লাহ।
গ. রমাদ্বন আসার পূর্বেই শা’বান মাসে যথা সম্ভব নফল সওম রাখার পরিমাণ বাড়িয়ে দিন৷ আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল (সাঃ) শা’বান মাসে এতো বেশি পরিমাণে সওম পালন করতেন যে, আমাদের মনে হত, তিনি আর সওম ত্যাগ করবেন না। আবার যখন সওম ত্যাগ করতেন, আমাদের মনে হত, এবার আর সওম পালন করবেন না। এবং আমি রাসূল (সাঃ) কে রমাদ্বন মাস ছাড়া অন্য কোন মাসে পরিপূর্ণ সওম পালন করতে দেখিনি; এবং শা’বান মাসের মত এতো বেশি পরিমাণে সওম অন্য কোন মাসে পালন করতে দেখিনি৷ [সহীহ বুখারী ও মুসলিম]

রমাদ্বনে যেসকল ইবাদতে বেশি মনোযোগ দিতে হবে:

ক. যথা সময়ে ফরজ স্বালাত আদায় করুন এবং যথা সম্ভব নফল স্বালাত আদায়ের পরিমাণ বাড়িয়ে দিন৷
খ. রমাদ্বনের সিয়াম যত্ন সহকারে পালন করুন৷ সওম ভঙ্গ করে বা হাল্কা করে দেয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকুন৷ এসব কাজের আশেপাশে না যেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন৷
গ. বেশি বেশি আল কুরআন তিলাওয়াত করুন এবং তাসবীহ-তাহলীল, যিকর আজকারে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন।
ঘ. নিয়মিত কিয়ামুল লাইল আদায় করুন৷
ঙ. লাইলাতুল কদর অন্বেষণে রমাদ্বনের শেষ দশকে আল্লাহর ইবাদাতে অধিক মনযোগী হন৷ সম্ভব হলে মাসজিদে ইতেক্বাফ করুন৷ ক্বদরের রাত এক হাজার মাসের চেয়ে উত্তম৷ রাসূল সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
“যে ব্যাক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে মূলত সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো [সুনানে নাসাঈ]
চ. বেশি বেশি দান-সদাকা করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى بِالْحُسْنَى فَسَنُيَسِرُهُ لِلْيُسْرَى

“অতএব, যে দান করে এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করে এবং উত্তম বিষয়কে সত্য মনে করে৷ আমি তার জন্য সহজ পথে চলা সহজ করে দেবো।” [সূরা আল-লাইল: ৫-৭]

“আল্লাহর রাসূল সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দানশীল, রমাদ্বনে তিনি আরো অধিক দানশীল হতেন৷ রমাদ্বন মাসে তিনি প্রবাহিত বাতাসের মতো দান করতেন৷” [সহিহ বুখারী ও মুসলিম]

ছ. ইফতার শুরু করুন খেজুর অথবা পানি দ্বারা এবং সায়েমদের ইফতার করান,বিশেষ করে মুজাহিদদের মধ্যে খেজুর ও ইফতার সামগ্রী বিতরন করুন৷

লাইলাতুল কদর (কদরের রাত্রী)’র ফজিলত:

কদরের রাত্রি হচ্ছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিন বন্দার জন্য এক অপূর্ব নিয়ামত৷ বান্দা যদি এই নিয়ামত পূর্নমাত্রায় কাজে লাগাতে পারে তাহলে এর মধ্যেই তার জীবনের সফলতা খুজে পাবে৷ এই রাতের ফজিলত অনেক, তার মধ্যে কিছু উল্লেখ করা হলো-

ক) এই রাতে কুরআন নাযিল হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন-

إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ

“নিশ্চয় আমি কুরআন নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে” [সূরা কদর- ১]

খ) এই মাস হাজার মাসের চেয়ে উত্তম৷ অর্থাৎ এই এক রাত্রীতে এমন সওয়াব হাসিল হবে যা কোন ব্যাক্তি তার ৮০ বছরেরও বেশি বয়সের জীবনে একাধারে আমল করলেও হাসিল হবে না। মহান আল্লাহ বলেন-

لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ

“লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ” [সূরা কদর- ৩]

গ) এই রাতে সকল কিছুর বাৎসরিক ভাগ্য নির্ধারিত হয়৷ মহান আল্লাহ বলেন-

فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ

“সে রাতে প্রত্যেক চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত স্থিরকৃত হয়” [সূরা দুখান- ৪]

ঘ) এই রাত বরকত ও শান্তিময়। পুরো রাত জুড়ে বান্দাদের জন্য শান্তি ও বরকত নাযিল হয়৷ মহান আল্লাহ বলেন-

تَنَزِّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ

“এ রাতে ফেরেশতা আর রূহ তাদের রব এর অনুমতিক্রমে প্রত্যেক কাজে অবতীর্ণ হয়৷ (এ রাতে বিরাজ করে) শান্তি আর শান্তি – ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত” [সূরা আল কাদ্বর – ৪,৫]

ঙ) কদরের রাত্রিতে কিয়াম করলে বিগত জীবনের গুনাহ ক্ষমা করা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

مَنْ قَامَ لَيْلَةَ القَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ

“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় কদরের রাতে স্বালাতে দণ্ডায়মান হবে, তার পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে” [সহীহ বুখারী]

যাকাত হচ্ছে মুসলিম বান্দার উপর আল্লাহ তাআলার আরেক ফরজ বিধান:

যাকাত ইসলামের ৫টি মূল স্তম্ভের অন্যতম। নাবী সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

بنِي الإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ : شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةَوَالحَجَ وَصَوْمِ رَمَضَانَ

“ইসলাম ৫টি বুনিয়াদের উপর নির্মিত, এই স্বাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রাসূল, স্বলাত কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, হাজ্জ পালন করা ও সিয়াম পালন করা” [বুখারী ৮, মুসলিম ১২২] সুতরাং কালেমা ছাড়া যেমন কোন ব্যাক্তি মুসলিম হতে পারেনা তেমনি এই ৫টি স্তম্ভের কোনটি অস্বীকারকারী নিজেকে মুসলিম দাবী করতে পারবেনা। সারা বছরের আয় ইনকামের একটা অংশ গরিব মিসকিনসহ যাকাতের নির্দিষ্ট খাতগুলোতে ব্যয় করতে হবে৷ যাকাত প্রদানের মাধ্যমে মূলত আমাদের সম্পদকে আমরা হালাল করে নেই। যাকাত প্রদানের যোগ্য হওয়া সত্বেও তা আদায় না করলে আমাদের সমুদয় সম্পদ হারাম সম্পদে পর্যবসিত হবে৷ এই বিধানে ত্রুটিকারীর ব্যাপারে খুব কড়া হুশিয়ারী এসেছে৷ আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু যাকাতের উটের একটি রশি দিতে অস্বীকারকারীর বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। অথচ আমাদের সামাজিক জীবনে এই যাকাতের ব্যাপারে পড়াশোনা ও চর্চা আশংকাজনক হারে কম৷ যাকাতের বিধানগুলো জানে এমন লোকের সংখ্যা খুবই কম৷ অধিকাংশ মানুষ তাদের উপর ফরজ হয়ে থাকা যাকাত বছরের পর বছর না দিয়ে নিজেদের হালাল ইনকামের টাকা হারাম করে তা ভোগ করছে৷ তাই এই রমাদ্বনেই হোক যাকাতের সকল মাসআলা মাসায়েল জেনে তা আমলের সূচনা।

সংক্ষেপে যাকাতের কিছু বিধান:

যাকাতের শর্তসমূহ- কারো হাতে গচ্ছিত অবস্থায় সাড়ে ৭ ভরি সোনা বা সাড়ে ৫২ ভরি রুপার সমপরিমান সম্পদ ১ বছর থাকলে তার উপর শতকরা ২.৫% হারে যাকাত আদায় করতে হবে, অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকায় আড়াই টাকা৷ উলামায়ে-কেরাম বলেন সাড়ে ৭ ভরি সোনার চেয়ে সাড়ে ৫২ ভরি রুপার হিসাবকে মানদন্ড ধরে তা আদায় করা অধিকতর উত্তম৷

যাকাতের খাতসমূহ:

যাকাত যেমন আল্লাহ তাআলা ফরজ করেছেন, একইভাবে তিনি যাকাতের খাতগুলোও আমাদের জন্য বলে দিয়েছেন৷ আল্লাহ তাআলা বলেন-

إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

“যাকাত হচ্ছে কেবল ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়কারী, যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাস মুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্থদের জন্য, আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের জন্য এবং মুসাফিরদের জন্য৷ এই হলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান৷ আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়” [সূরা তাওবাহ : ৬০]

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ৮টি খাত উল্লেখ করেছেন, আমাদের ফরজ যাকাতগুলো এই ৮টি খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে৷ সেগুলো হচ্ছে:

১ ও ২। ‘ফকীর ও মিসকীন’ (নিঃস্ব-অভাবগ্রস্ত): যেহেতু উভয় শব্দ প্রায় সমতুল্য; একটি অপরের জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে। অর্থাৎ, ফকীরকে মিসকীন ও মিসকীনকে ফকীর বলা হয়ে থাকে। সেহেতু এই দুয়ের সংজ্ঞাতে বেশ মতপার্থক্য রয়েছে। যদিও উভয় শব্দের অর্থে এ কথা সুনিশ্চিত যে, যে অভাবী, যে নিজ প্রয়োজন ও দরকার পূর্ণ করার জন্য চাহিদা অনুযায়ী টাকা-পয়সা ও উপকরণ থেকে বঞ্চিত, তাকেই ফকীর-মিসকীন বলা হয়। ফকীর হল যার কিছুই নেই এবং মিসকীন হল যে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নয়। [কুরতুবী] ফকীর ও মিসকীনের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও তারা যাকাতের হুকুমে সমান। মোটকথাঃ যার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ অর্থ নেই তাকে যাকাত দেয়া যাবে এবং সেও নিতে পারবে। প্রয়োজনীয় মালামালের মধ্যে থাকার ঘর, ব্যবহৃত বাসন-পেয়ালা, পোশাক পরিচ্ছদ ও আসবাব পত্র প্রভৃতি শামিল রয়েছে। সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ কিংবা সাড়ে বাহান্ন তোলা রূপা বা তার মূল্য যার কাছে রয়েছে এবং সে ঋণগ্রস্ত নয়, সেই নেসাবের মালিক। তাকে যাকাত দেয়া ও তার পক্ষে যাকাত নেয়া জায়েয নয়। [কুরতুবী] ইবরাহীম নাখায়ী (রহ.) বলেছেন, ফকির বলতে এখানে মুহাজির (যারা হিজরত করেছে) ফকিরদের বুঝানো হয়েছে। [ইবনে কাসীর] মিসকীনের ব্যাপারে এক হাদীস এসেছে যে, নবী (সাঃ ) বলেছেন, ‘মিসকীন’ সে নয় যে দু-এক লোকমার জন্য বা দু-একটি খেজুরের জন্য লোকের দরজায় দরজায় ঘুরে ফিরে বেড়ায়। বরং ‘মিসকীন’ তো সেই যার কাছে এতটা পরিমাণ মাল থাকে না, যাতে তার প্রয়োজন মিটে যায়। যে না নিজের দরিদ্রতাকে প্রকাশ করে যে, লোকে তাকে গরীব ও হকদার বুঝে স্বাদক্বা-খায়রাত করবে। আর না সে নিজে থেকে কারো কাছে সাহায্য কামনা করে। [বুখারী ও মুসলিম যাকাত অধ্যায়] হাদীসে আসল মিসকীন উক্ত ব্যক্তিকে নির্ধারণ করা হয়েছে।
৩। আল আমিলিনা আলাইহাঃ যারা যাকাত উসুলের কাজ করে যেমন সংগ্রহ, বন্টন বা এমন যে কাজগুলো আছে।
৪। মুআল্লাফাহঃ যেসব কাফের নেতাদেরকে সম্পদ দেওয়ার মাধ্যমে ইসলাম কবুল করা অথবা তাদের শত্রুতা কমানোর সম্ভাবনা আছে।
৫। রিকাবঃ দাস বা বন্দি মুক্তি, যেমন আল্লাহর রাস্তায় কাজ করতে গিয়ে যারা বন্দি হয়েছে। বন্দিমুক্তি করার ফজীলত

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أَعْتَقَ رَقَبَةً مُسْلِمَةً أَعْتَقَ اللَّهُ بِكُلِّ عُضْوٍ مِنْهُ عُضْوًا مِنَ النَّارِ حَتَّى فَرْجَهُ بِفَرْجِهِ»

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো মুসলিম গোলামকে মুক্ত করবে আল্লাহ তা’আলা তার প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে তার প্রতিটি অঙ্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিবেন। এমনকি ঐ ব্যক্তির গুপ্তাঙ্গও তার গুপ্তাঙ্গের বিনিময়ে মুক্তি দিবেন। [সহীহ : বুখারী ৬৭১৫] মহান আল্লাহ বলেন-

وَيُطْعِمُونَ ٱلطَّعَامَ عَلَىٰ حُبِّهِۦ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا . إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ ٱللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنكُمْ جَزَآءً وَلَا شُكُورًا

অর্থ: তারা খাদ্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকীন, ইয়াতীম ও বন্দীকে খাদ্য দান করে। এবং বলেঃ কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি, আমরা তোমাদের নিকট হতে প্রতিদান চাইনা, কৃতজ্ঞতাও নয়। [সূরাঃ আদ দাহর ৮,৯]

এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমরা কয়েদি মুক্ত কর, ক্ষুধার্তকে খাওয়াও এবং অসুস্থদের সুশ্রুষা কর।’’ [বুখারী: ৩০৪৬]

ইবনে হাজার আসকালানী (রহ:) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ফাতহুল বারিতে বলেন, এই মুক্ত করা সম্পদ দিয়ে অথবা অন্য যে কোন উপায়ে হতে পারে।

৬। গারিমঃ নিজের মুবাহ প্রয়োজন মিটাতে গিয়ে কর্য করেছে অথবা অন্যদের উপকার করতে গিয়ে কর্য করেছে।
৭। ফি সাবিলিল্লাহঃ আল্লাহর পথঃ এর অর্থ হল জিহাদ। অর্থাৎ, যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম, অস্ত্রশস্ত্র ও প্রয়োজনীয় আসবাব-পত্র ক্রয় করতে এবং মুজাহিদের জন্য (চাহে সে ধনবান হোক না কেন) যাকাতের মাল ব্যয় করা জায়েয। [আহসানুল বায়ান]
রাসুল (সাঃ) বলেছেন,

مَنْ قَاتَلَ لِتَكُونَ كَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ‏

যে ব্যক্তি এ উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে যে, আল্লাহর বাণী সমুন্নত করবে, (কেবল) সে (ফি সাবিলিল্লাহ) আল্লাহর রাস্তায় (বলে গণ্য হবে)। [মুসলিম ৩৩/৪২]

কেন আমাদের উচিত, ফি সাবিলিল্লাহ খাতেই যাকাত আদায় করাঃ

সম্মানিত ঈমানদার এবং মু’মিন ভাইগণ, আমরা আল্লাহর জন্যই কেবল আপনাদেরকে ভালোবাসি কারণ আজ আপনারা মুজাহিদদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করেছেন একমাত্র আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ের জন্যই। ইমান আমাদেরকে দুনিয়াতে একত্রিত করেছে এবং এই ইমানই আমাদেরকে জান্নাতেও একত্রিত করবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাদের উপর অনেক বড় অনুগ্রহ করেছেন, যাদেরকে তিনি মুজাহিদদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছেন। সম্মানিত ভাইয়েরা গভীরভাবে একটু চিন্তা করুন, একটি জিহাদি জামা’আত মানেই একটি সামরিক সংগঠন। ত্বাগুতগোষ্ঠি যাদের সবচেয়ে বেশি ভয় করে এবং যাদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় থাকে তারাই হলো আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদ। কিন্তু ত্বাগুতের অন্তরে এই ভয় ততক্ষণ পর্যন্ত বজায় থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা তাদের বিরুদ্ধে ক্বিতাল চালিয়ে যাবো। এই ক্বিতাল চালিয়ে যাওয়া নির্ভর করছে, আমাদের মুজাহিদদের উন্নত প্রশিক্ষণ এবং উন্নত সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করার উপর। আর এই বিষয়গুলো সরাসরি অর্থনৈতিক সাপোর্টের উপর নির্ভরশীল। তাই যারা নিজেদের যাকাত আদায় করবে ফি সাবিলিল্লাহ খাতে, তারা সরাসরি অবদান রাখবে বৈশ্বিক কুফফার জোটের বিরুদ্ধে চলমান এই বরকতময় জিহাদে ইনশাআল্লাহ। এছাড়াও হৃদয় দিয়ে চিন্তার বিষয় হলো, একটি জিহাদি জামা’আতে বিভিন্ন পরিস্থিতির মুজাহিদদের উপস্থিতি থাকে। কেউ দুনিয়াবি উপার্জন থেকে বিরত হয়ে ফকির (ইহসার) হয়েছেন শুধুমাত্র আল্লাহর দ্বীনের কাজ করতে গিয়ে। কেউ ত্বাগুতের জিন্দানখানায় বন্দী হয়েছেন শুধুমাত্র আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করতে গিয়ে। কেউ মুসাফির হয়েছেন জিহাদের দাওয়াত সকল প্রান্তে পৌঁছে দিতে। একইভাবে ঋণগ্রস্থ, আমিল, মিসকিন আরোও কত ধরনের মুজাহিদ পাওয়া যাবে যারা শুধুমাত্র উক্ত পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন জিহাদের কাজ করতে গিয়ে। তাই আমরা যদি আমাদের বাৎসরিক যাকাত ফি সাবিলিল্লাহ এর খাতে আদায় করি তবে একদিকে অন্যান্য ৭ টি খাতে আদায় করা যেমন হয়ে যাবে তেমনি দ্বীন কায়েমের ক্ষেত্রেও অবদান রাখা হবে ইনশাআল্লাহ।


৮। ইবনুস সাবীলঃ যাদের সফরে থাকা অবস্থায় রশদ শেষ হয়ে গিয়েছে।

যাকাতের সময়:

যাকাত বছরের যেকোন সময় দেওয়া যায়৷ তবে রমাদ্বন যেহেতু বরকতের মাস তাই রমাদ্বনকে টার্গেট করেই যাকাত আদায় করা উত্তম বলে মত দেন উলামাগণ৷ তাই রমাদ্বনের যেকোন একটা দিন নির্দিষ্ট করে সেই দিন থেকেই আপনার যাকাতের বছর গণনা করতে পারেন৷ যেই দিন নির্ধারিত করবেন সেই দিন থেকে পরের বছরের রমাদ্বনের একই দিন পর্যন্ত সাড়ে ৫২ ভরি রুপা বা তার বেশি যেকোন পরিমান সম্পদ কোন প্রকার ব্যবহার হওয়া ছাড়াই আপনার হাতে গচ্ছিত থাকলে তার উপর ২.৫% হিসাব করে যাকাত আদায় করতে হবে।

যাকাতুল ফিতর বা ফিতর এর যাকাত:

রমাদ্বন এলেই যাকাতুল ফিতর এর প্রসঙ্গ এসে যায়৷ কারন ১ মাস সিয়াম সাধনার পরে ঈদুল ফিতরের দিনে আমরা যখন সামাজিকভাবে আনন্দে দিন কাটাই তখন এমন অনেক মানুষ থাকে যাদের মুখে খাবার জুটেনা৷ তাই সবাই যেন ঈদ আনন্দে শরিক হতে পারে সেই জন্য এই যাকাতুল ফিতরের বিধান দিয়েছেন আল্লাহ রব্বুল আলামীন। যাকাতুল ফিতরের আরেকটি কারণ হচ্ছে, রোযাদারের পবিত্রতা অর্জন ও সিয়ামে পূর্নতা আনা৷ স্বভাবতই ১ মাস সিয়াম পালনের সময় অনেক ভুলভ্রান্তি ও সিয়ামকে হালকা করে এমন কাজ বা কথা হয়ে থাকতে পারে, এই ঘাটতিগুলো পূরনের মাধ্যম হচ্ছে যাকাতুল ফিতর৷ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণীত হাদিসে নাবী সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ-

زَكَاةَ الْفِطْرِ; طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ, وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ, فَمَنْ أَدَّاهَا قَبْلَ الصَّلَاةِ فَهِيَ زَكَاةٌ مَقْبُولَةٌ, وَمَنْ أَدَّاهَا بَعْدَ الصَّلَاةِ فَهِيَ صَدَقَةٌ مِنَ الصَّدَقَاتِ

“যাকাতুল ফিতর হচ্ছে সিয়ামপালনকারীর জন্য অহেতুক কথা ও কাজ এবং অশ্লিলতা থেকে পবিত্রকারী ও মিসকিনদের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা। সুতরাং যে এই যাকাত (ঈদের) স্বালাতের পূর্বে আদায় করবে তারটা কবুল হবে, কিন্তু স্বালাতের পরে আদায় করলে তা সাধারণ সাদাকা হিসাবে গণ্য হবে। [আবূ দাউদঃ ১৬০৯]

সুতরাং ফিতরের যাকাত অবশ্যই ঈদের স্বলাতের আগে আদায় করে তারপর ঈদের স্বলাতে যেতে হবে৷ যার ঘরে একদিনের খাবারের অতিরিক্ত খাবার থাকবে তার উপর ফিতরের যাকাত ওয়াজিব এবং তা পরিবারের ছোট, বড়, দাসদাসী, বালেগ, নাবালেগ সবার পক্ষ থেকেই আদায় করতে হবে৷ যাকাতুল ফিতরের পরিমাণ হচ্ছে এক সা’ খাদ্য৷ এক সা’ হচ্ছে পূর্ণ বয়স্ক একজন মানুষ ২ হাতের আজলা ভরে যতটুকু খাদ্য নিতে পারে সেরকম ৪ আজলা। অর্থাৎ, ৪ আজলা = ১ সা’ | বর্তমানে কেজির হিসাবে তা কিছুটা ভিন্নতার সাথে আনুমানিক ২৪০০ গ্রাম থেকে ২৫০০ গ্রাম এর মধ্যে হয়৷ নিরাপদ পদ্ধতি হচ্ছে আপনি আপনার ২ হাত এক করে ৪ বার নিয়ে সেটাকে ১ সা’ হিসাব করে পরিবারের সবার পক্ষ থেকে দিয়ে দিতে পারেন৷ ১ জনের জন্য ১ সা’ । এভাবে পরিবারে যত সদস্য থাকবে তত সা’ খাদ্য দিয়ে যাকাতুল ফিতর আদায় করবেন৷

যাকাতুল ফিতর আদায়ের পদ্ধতি:

যাকাতুল ফিতর খাদ্য দিয়েই আদায়যোগ্য, সুতরাং খাদ্যের মূল্য দিয়ে যাকাতুল ফিতর আদায় করবেন না৷ নাবী ও তাঁর সাহাবিগণ কেউ মুদ্রা দিয়ে যাকাতুল ফিতর আদায় করেননি৷ তাই খাদ্য দিয়ে যাকাতুল ফিতর আদায় করাটাই নববী ও বুনিয়াদী পদ্ধতি। আল্লাহ আমাদেরকে ফিতরের যাকাত পুর্ণভাবে আদায়ের তাওফিক দান করুন। (আমিন)

রমাদ্বনকে বিদায় জানানো:

হে আল্লাহর বান্দা আল্লাহকে ভয় করুন, এই মাসকে ভালোভাবে বিদায় জানান এবং আল্লাহর নিয়ামতরাজিকে কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করুন, আর নাফসের কুপ্রবৃত্তি ও সীমালঙ্ঘন থেকে বিরত থাকুন এবং বিগত দিনগুলোতে যা হারিয়েছেন তা অর্জন করার চেষ্টা করুন, জিহাদের পথে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় দৃঢ় থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সকল পাথেয় এই রমাদ্বন মাস থেকেই সংগ্রহের সর্বাত্মক চেষ্টা চালান, কেননা যে মাসটি শেষ হতে চলল আগামী দিনে এই মাসটিই আপনার পক্ষে বা বিপক্ষে স্বাক্ষী হবে৷ অবশ্যই তাওবাহ ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে এর পরিসমাপ্তি ঘটাবেন৷

হে রব্বে কারীম! আপনি যদি আমাদের জন্য আবার এই মাসটি নির্ধারণ করে থাকেন তাহলে তাতে বারাকাহ দিন৷ আর যদি আমাদের মেয়াদ শেষের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন তাহলে আমাদের যারা অবশিষ্ট থাকবে তাদেরকে এর উত্তম প্রতিনিধি বানান৷ যারা গত হয়ে গেছে তাদের উপর আপনার রহমত প্রসারিত করে দিন৷ আমাদের সকলকে আপনার অফুরন্ত রহমত ও অবারিত ক্ষমা নসিব করুন৷ হে আল্লাহ আমাদেরকে, আমাদের পিতা-মাতাকে, আমাদের মুজাহিদ ভাইদেরকে এবং জীবিত- মৃত সকল মুসলিমদেরকে আপনার দয়ায় ক্ষমা করুন৷ (আমীন ইয়া রব্বুল আলামীন)

واخر دعوانا ان الحمد لله رب العالمین

মন্তব্য

WORDPRESS: 0